নিজস্ব প্রতিবেদক:

কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সারাদেশে গত এক মাসের বন্যায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানিতে বিভিন্ন জেলার কৃষকের আউশ ও আমন ধান, আমনের বীজতলা, পাট, সবজি, ভুট্টা, পান, বাদাম ও ফলমূল নষ্টের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ের ঢল ও নদনদীর পানি বৃদ্ধির কারণে গত ১১ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৩৭ জেলায় এক লাখ ৮০ হাজার ৯৩৮ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে এক লাখ ১৬ হাজার ৮৯৬ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতির পরিমাণ ৯৭৪ কোটি টাকা। ফসলের পরিমাণের হিসাবে তিন লাখ ৯৭ হাজার ৮৪৭ টন ক্ষতি হয়েছে। ৯ লাখ ২৯ হাজার ১৯৪ কৃষক এই ক্ষতির শিকার। তারা সংকটে আছেন।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বন্যা যদি আর না হয়, তাহলে এই ক্ষতি সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। এরই মধ্যে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, সামনে অনেক বেশি ফসল উৎপাদন হবে।

এ বিষয়ে কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আমনের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।

ফলে বোনা আমনের ক্ষতি কিছুটা হলেও কাঠিয়ে ওঠা যাবে। যেখানে সবজিচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেখানে দ্রুত ফলনশীল সবজির বীজ দেওয়া হয়েছে; যাতে দ্রুত সবজির সরবরাহ বাড়ে। এখন মাষকলাইয়ের বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী ৭ তারিখের মধ্যে মাষকলাইয়ের বীজ সরবরাহ শেষ হবে। তবে রোপা আমন চাষিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রোপা আমনের সময় এখন আর নেই। সে জন্য রবি মৌসুমে সরিষা, গম, ভুট্টা, খেসারি বীজ ও সার বিনামূল্যে এসব কৃষককে দেওয়া হবে। এ ছাড়া আউশের জমিতে যাতে আমন করতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধানের। ২৩ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান বন্যায় তলিয়ে গেছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন ধান উৎপাদনের আশা করা হয়েছিল। ৪৭ হাজার হেক্টর জমির বোনা আমন ও ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমির রোপা আমন নষ্ট হয়েছে। এসব জমি তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় এক লাখ টন ধান পাওয়া যায়নি। ১৯০ কোটি টাকার সবজির ক্ষতি হয়েছে। পাটের ক্ষতি হিসাব করা হয়েছে ৮৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া মরিচ, ভুট্টা, তিল, চীনাবাদাম, লেবু, কলা ও আখের ক্ষতি হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। বন্যার এই ক্ষতিতে বাজারে সবজির সরবরাহ কমেছে। পাশাপাশি ধানের মোট উৎপাদনও কম হবে। পাট উৎপাদনও লক্ষ্য অনুযায়ী হবে না।

জানা গেছে, কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মন্ত্রণালয় ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকার কৃষি উপকরণ বিতরণ করবে। এরই মধ্যে কৃষকদের মধ্যে লালশাক, ডাঁটাশাক, পালংশাক, বরবটি, শিম, শসার বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৭৫ কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি নিতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়।

মানিকগঞ্জ জেলায় ক্ষতি হয়েছে ১৫৭ কোটি টাকা। এ জেলায় বোনা আমনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ১০৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে জামালপুর জেলায়। এই জেলায় পাট, আউশ ধান, সবজি ও আমনের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে। ১১৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে ফরিদপুর জেলায়। পদ্মাপাড়ের এই জেলায় রোপা আমন, বোনা আমন ও আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে। মাদারীপুরে ৭৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পাট, পান ও বোনা আমনের বেশি ক্ষতি হয়েছে এই জেলায়। টাঙ্গাইলে ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে ৬৭ কোটি টাকা।

বোনা আমন, আমনের বীজতলা ও সবজির বেশি ক্ষতি হয়েছে। ৭০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে ঢাকা জেলায়। গ্রীষ্ফ্মের সবজির ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

এ ছাড়া বন্যায় রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, দিনাজপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও কুষ্টিয়া জেলার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *