সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:

সাতক্ষীরায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে জেলা যুবলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও এক ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে জখম করেছে জেলা ডিবি পুলিশ সদস‌্যরা।

সোমবার (৭ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে একটা পর্যন্ত শহরের টাউন বাজার তিন রাস্তার মোড় ও কাটিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে আটকে রেখে সাতক্ষীরা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক ফারুখ হোসেন ও তার তিন সহযোগী এ নির্যাতন চালান।

সাতক্ষীরা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াছিন আলম চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শহরের টাউন বাজারে নোমান ফাস্ট ফুডের মালিক বাচ্চু হোসেন জানান, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি দোকান খুলছিলেন। সেসময় ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক ফারুক হোসেন তার দোকানের সামনে একাংশ জুড়ে মোটরসাইকেল রাখেন। দোকান খোলার সমস্যা হবে বলে আপত্তি করলেও সাদা পোশাকে থাকা ওই পুলিশ কর্মকর্তা আপত্তি শোনেননি। সস্ত্রীক তিনি দোতলায় অবস্থিত উজ্জল বস্ত্রালয়ে চলে যান।

বাচ্চু হোসেন সেখানে গিয়ে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে আবারও মোটরসাইকেলটি সরানোর কথা বলেন। এতে ওই পুলিশ দম্পতি রেগে গিয়ে তাকে মারতে উদ‌্যত হন। এসময় বাচ্চু দোকান মালিক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবুর ভাই লিটনকে মোবাইল ফোনে ঘটনা জানিয়ে নিচে নেমে যান।

উজ্জল বস্ত্রালয়ের কর্মচারী সালাউদ্দিন জানান, দোকান মালিক শেখ সাদেক হোসেন উজ্জল ওই পুলিশ কর্মকর্তার মোটরসাইকেলটি সরানোর জন্য অনুরোধ করে তার কাছে চাবি চান। এতে ক্ষুব্ধ হন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি উজ্জলকে লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দেন। সেসময় উজ্জল ওই পুলিশ কর্মকর্তার পায়ে ধরে ক্ষমা চান।

এমন সময় উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই লিটন ঘটনাস্থলে হাজির হন। ঘটনা জানতে চাইলে আরও রেগে যান ওই পুলিশ কর্মকর্তা এবং তার স্ত্রী। লিটনের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হয় তাদের। পরে লিটন সেখান থেকে চলে যান।

লিটন চলে যাওয়ার পর সেখানে উপস্থিত হন জেলা যুবলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী জুলফিকার হোসেন উজ্জল। বস্ত্র ব্যবসায়ী উজ্জলকে মারধর করার প্রতিবাদ করায় ওই পুলিশ কর্মকর্তা কাউন্সিলর পদপ্রার্থী উজ্জলকেও মারতে উদ‌্যত হন। এর কিছুক্ষণ পর কাটিয়া পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য মোস্তাক আলী ঘটনাস্থলে হাজির হন। প্রায় একই সঙ্গে একটি প্রাইভেট কারে করে ঘটনাস্থলে আসেন ডিবি পুলিশের তিন সদস্য।

‘পুলিশের গায়ে হাত দিয়েছে এত বড় সাহস কার’ একথা বলতে বলতে ডিবি পুলিশের প্রাইভেট চালিয়ে আসা ওই পুলিশ সদস্যরা গাড়ি থেকে লাঠি বের করে ব্যবসায়ী উজ্জল ও যুবলীগ নেতা উজ্জলকে এলোপাতাড়ি পেটানো শুরু করেন।

এসময় তাদের দুজনকে কিল, চড় ও লাথি মারেন পুলিশ কর্মকর্তা ফারুখ হোসেন। পরে দুই উজ্জলকে পেটাতে পেটাতে কাটিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের আটকে রেখে দ্বিতীয় দফায় বেধড়ক পেটানো হয়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা ফাঁড়িতে ঢোকার চেষ্টা করে। ঢুকতে না পেরে তারা ফাঁড়ি ঘেরাও করে রাখে। খবর পেয়ে সদর থানার একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সেসময় ফাঁড়ি থেকে যুবলীগ নেতা উজ্জলকে ছেড়ে দেওয়া হলেও আটক রাখা হয় ব্যবসায়ী উজ্জলকে। প্রায় এক ঘণ্টা পর উজ্জলের মাসহ স্বজনরা গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনেন। পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী সিবি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন উজ্জল। পরে পুলিশ উজ্জল বস্ত্রালয়ে সিসি ক্যামেরার বিশেষ অংশ খুলে নিয়ে যায়।

কাটিয়া মাস্টারপাড়ার মোস্তাফিজুর রহমান ও তার ভাই আমিনুর রহমান বলেন, ‘‘আমাদের ভাই যুবলীগ নেতা জুলফিকার হোসেন উজ্জলকে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরপরই পুলিশের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে আসেন। তারা জেলা যুবলীগের সাবেক এক নেতাকে ম্যানেজ করে দ্রুত সদর হাসপাতাল থেকে উজ্জলের ছাড়পত্র নিয়ে নেন। উজ্জলের উন্নত চিকিৎসার কথা বলে সিবি হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে আমরা আপত্তি করি।

‘সেসময় মেডিক‌্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বললে পুলিশ রাজী হয়। এক পর্যায়ে জেলা পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে করে উজ্জলকে জোর করে সিবি হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ। সেখানে ভর্তি করার সময় মেডিক‌্যাল সার্টিফিকেট বা চিকিৎসাপত্র নিতে পারবে না বলে সিবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাদের দুই ভাইয়ের কাছ থেকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেন।”

তারা আরও বলেন, ‘ভর্তির পরপরই পুলিশ কর্মকর্তারা দোষী উপ-পরিদর্শকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ও যাবতীয় চিকিৎসা খরচ বহন করার কথা বলে বিষয়টি মিটিয়ে নিতে বলেন। এসময় ব্যবসায়ী উজ্জলকেও চিকিৎসার জন্য সিবি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ব‌্যবসায়ী উজ্জলের ডান হাত থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল।’

যুবলীগ নেতা জুলফিকার হোসেন উজ্জল বলেন, ‘সামান‌্য কারণে পুলিশ যে অমানুষিক নির্যাতন করেছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। জেলা যুবলীগের শীর্ষ পর্যায়ে থেকে যেভাবে নির্যাতিত হলাম- সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী ঘটে তা জানতে আর কারও বাকী থাকল না। বিষয়টি নিয়ে দলীয় প্লাটফর্মে পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

ব‌্যবসায়ী শেখ সাদিক হোসেন উজ্জল বলেন, ‘পুলিশ যে ঘটনা ঘটিয়েছে তাতে ব্যবসা করার মানসিকতাটাই হারিয়ে গেছে।’

এদিকে ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক ফারুক হোসেনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আর ফোন রিসিভ করেননি।

কাটিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ টিএসআই মিজানুর রহমান বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনার কারণে পুলিশকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হবে।’

সাতক্ষীরা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াছিন আলম চৌধুরী জানান, বিষয়টি দুঃখজনক। ভুল বোঝাবুঝির কারণে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। তবে বিষয়টি উভয়পক্ষ আলোচনা সাপেক্ষে মীমাংসা হয়ে গেছে। দোষী পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপার মহোদয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *