আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

মার্কিন নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ১১ দিন। তার আগেই আজ শুক্রবার (বাংলাদেশ সময়) নির্বাচন পূর্ব শেষ লাইভ টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেট দল থেকে তার পদটি চ্যালেঞ্জকারী জো বাইডেন।

শেষ তর্কে ট্রাম্পকে অনেক সতর্ক দেখায়। আগ্রাসী আচরণ সীমিত করে, তিনি যুক্তির কৌশল নেন এসময়।

তবে দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ণবাদ এবং কোভিড অতিমারি মোকাবিলা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপক ভিন্নতা দেখা গেছে।

ভোটার জরিপে এখনও এগিয়ে আছেন জো বাইডেন। তবে সমর্থন বেশি থাকা মানেই- নির্বাচনে সুনিশ্চিত জয় নয়। তাছাড়া, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে ‘সুইং স্টেট’ বলে পরিচিত রাজ্যের ভোটাররা। সেখানে বাইডেনের এগিয়ে থাকার ব্যবধান অনেকটাই কম।

এসব কারণে শেষ নির্বাচনী বাগযুদ্ধ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিতর্কটির নানা দিক তুলে ধরেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। এবং তা বিশ্লেষণ করেছেন বিবিসি’র উত্তর আমেরিকা প্রতিনিধি অ্যান্থনি জার্চার।

কেমন ছিল যুক্তি-তর্কের সামগ্রিক সুর: 

যুক্তরাষ্ট্র সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত বিতর্কটি হয়েছে টেনিসি রাজ্যের ন্যাশভিল শহরে।

দুই প্রার্থী গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রথম বিতর্কের সময় যেভাবে পরস্পরের প্রতি অপমানসূচক গালাগালি বিনিময় করেছেন- তার চাইতে অনেক কম আগ্রাসন দেখা গেছে শেষ বিতর্কে। বরং নানা বিষয়ে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা দিয়েছেন তারা। ট্রাম্প-বাইডেন দুজনেই আগ্রাসী ছিলেন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণে কেউই কম যাননি। তবে প্রথমবারের মতো বিশৃঙ্খল দশা এবার তৈরি হয়নি।

প্রথম বিতর্কের অনিভিপ্রেত ঘটনায় এবার প্রার্থীদের নিজ বক্তব্য উপস্থাপন শুরুর সময়, প্রতিপক্ষের মাইক্রোফোন বন্ধ রাখার পদক্ষেপ নেন আয়োজকরা। কথার মাঝে প্রতিপক্ষের বাধা সৃষ্টি এড়াতেই নেওয়া হয় এ পদক্ষেপ।

এনবিসি চ্যানেলের উপস্থাপক ক্রিস্টেন ওয়েলকার- এর পরিচালিত ৯০ মিনিটের বিতর্কে দুই প্রার্থী একে-অপরের প্রতি অনেকবার ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন। দুজনের মধ্যেই পরস্পরের প্রতি অপছন্দ ছিল একেবারে স্পষ্ট।

তারা সমাপনী বক্তব্যে ভোটারদের উদ্দেশ্যে; করোনার অতিমারি মোকাবিলা, অর্থনীতি উন্মুক্তকরণ, জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নানা বিষয়ে নিজেদের সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন ।

করোনাভাইরাস চলে যাবে: 

ট্রাম্প ও বাইডেনের চিন্তা-ভাবনার পার্থক্য সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মহামারি ঘিরে তাদের উপস্থাপিত পরিকল্পনায়।

বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিলে আরও লকডাউন দেবেন কিনা; এমন প্রশ্ন করা হলে ডেমোক্রেট প্রার্থী বাইডেন- সে সম্ভাবনা নাকচ করেননি।

তবে এ উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মন্দা কবলিত অর্থনীতিকে আরও ক্ষতির মধ্যে ফেলাটা ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

সংক্রমিত লোকজন নিজেরাই সেরে উঠছেন এবং একারণে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করার কোনো দরকার নেই, বলে তিনি উল্লেখ করেছেন, ”আমাদের দেশটি বিশাল। এবং অর্থনীতিও সবচেয়ে বড়। মানুষ চাকরি হারাচ্ছে। আত্মহত্যা করছে। বিষণ্ণতা, অ্যালকোহল ও মাদকাসক্তি এমন হারে বাড়ছে- যা আমরা আগে কখনোই দেখিনি,” ট্রাম্প যুক্তি দেন।

ট্রাম্প দাবি করেন, ভাইরাস বিদায় নিচ্ছে এবং চলতি বছর শেষেই টিকা বাজারে পাওয়া যাবে।

বাইডেন অবশ্য, সতর্ক করে বলেন, দেশ গভীর অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন শীতকালে সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার বাড়ার আশঙ্কায়- তিনি এসময়কে ‘ডার্ক উইন্টার’ বলেছেন।

ট্রাম্প তার জবাবে বলেন, আমরা এটি সঙ্গে করেই বাঁচতে শিখছি। ৭৭ বছরের বাইডেন সেই যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, স্বীকার করে নিন, আমরা বাঁচতে পারছি না, বরং দলে দলে মরছি।

মহামারিতে দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর জন্য বাইডেন প্রেসিডেন্টের উদাসীনতাকেই দায়ী করেছেন। অবহেলা করে ট্রাম্প নিজেও করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে, উল্লেখ করেন তিনি।

”এত বিপুল সংখ্যক জনতার মৃত্যুর জন্য দায়ি ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে থাকতে পারেন না’ বাইডেন বলেছেন।

‘সে বর্ণবাদের উস্কানিদাতা’:

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণ-বৈষম্য মোকাবিলা। এবং প্রার্থীদের বর্ণবাদ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি।

প্রসঙ্গটি নিয়ে আলোচনার সময়য় ট্রাম্প দাবি করেন, অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বর্ণ-বিদ্বেষী ব্যক্তি।

ট্রাম্প উল্লেখ করেন, ১৯৯৪ সালে একটি ক্রাইম বিলের খসরা প্রস্তুতে সাহায্য করেছিলেন জো বাইডেন। পরবর্তীতে পাস হয় অধ্যাদেশটি। ব্লাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন ওই বিলটি কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নে সহায়ক হয়েছে, বলে অভিযোগ করছে।

বাইডেন সরাসরি বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তবে তিনি দাবি করেন, ”যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণবাদি প্রেসিডেন্ট বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রপতি। তিনি সকল ধরনের জাতিগত বিদ্বেষের আগুনে জ্বালানির যোগান দেন।”

 ”এই লোকটি হিংসা ও বৈষম্যে উস্কানি দেওয়ার রাজনীতি করে। সে প্রকাশ্যে তার সমর্থকদের আরও বিদ্বেষী আচরণ করতে উৎসাহ দেয়,” বাইডেন যোগ করেন।

আক্রমণের মুখে এবার মাথা ঠাণ্ডা রেখেছিলেন জো বাইডেন। ফলে তার বয়স নিয়ে ট্রাম্প যে উপহাস করতে পারতেন বা মানসিক দৃঢ়তার অভাবকে বাধা হিসেবে তুলে ধরতে পারতেন- তিনি সে সুযোগ দেননি।

বিতর্ক পরবর্তী জরিপ অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ দর্শক বলেছেন, শেষ বিতর্কে বাইডেন জয়লাভ করেছেন। অন্যদিকে, ৩৯ শতাংশ দর্শক বলেছেন, এই বিতর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জিতেছেন।

সিএনএন ছাড়াও আরও দুটি জরিপে বিতর্কে বাইডেন জয়ী হয়েছেন বলে দর্শকেরা মত দিয়েছেন।

ডেটা প্রোগ্রেস জরিপ অনুযায়ী, বিতর্কে বাইডেনের জয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন ৫২ শতাংশ দর্শক। ট্রাম্পের জয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক।

  • সূত্র: বিবিসি / টিবিএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *