অনলাইন ডেস্ক:


সরকার নির্ধারিত সময়ে ঈদের আগে এখনও এপ্রিলের বেতন পাননি সব গার্মেন্টস শ্রমিক। ১০ মে দুপুর পর্যন্ত ২ হাজার ৮১৮টি অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ হয়নি। বোনাস পরিশোধ হয়েছে ৫ হাজার ২২৭টি কারখানায়। অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ কারখানায় বোনাস পরিশোধ হয়নি। মোট ৭ হাজার ৮৯২টি পোশাক কারখানার এই চিত্র উঠে এসেছে শিল্প পুলিশের জরিপে।

তবে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর দাবি, তাদের সংগঠনের সদস্যভুক্ত ৯০ শতাংশ কারখানার বেতন পরিশোধ হয়েছে। ৮ শতাংশ কারখানায় এখনও ঈদের বোনাস দেওয়া হয়নি।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ বলছে, যেসব কারখানা শ্রমিদের বেতন-বোনাস দেয়নি মঙ্গলবারের (১১ মে) মধ্যে তারা পরিশোধ করে দেবে।

এর আগে গত ২৯ এপ্রিল ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) সভায় মালিক-শ্রমিকরা মিলে সিদ্ধান্ত নেন, ১০ মের মধ্যে সব শ্রমিকের এপ্রিল মাসের বেতন এবং ঈদের বোনাস দিতে হবে। আরও সিদ্ধান্ত হয়, সরকারি ছুটির নির্দেশনা মোতাবেক অঞ্চলভিত্তিক বাই-রোটেশন ছুটির ব্যবস্থা করবে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।

এরপর রোববার (৯ মে) রাজধানীর শ্রম ভবনে আয়োজিত আরএমজি বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ (টিসিসি) সভায় শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুন্নুজান সুফিয়ান বলেন, ১০ মের মধ্যে সব গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে হবে।

এ বিষয়ে বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম বলেন, আমরা মাসের শুরু থেকেই বেতন বোনাস দিচ্ছি। গতকাল পর্যন্ত (১০ মে) বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ৯০ শতাংশ কারখানা শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস দিয়েছে। বাকি কারখানার বেতন-বোনাস পরিশোধে আমরা কাজ করছি।

একই কথা বলেন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ৯০-৯২ ভাগ গার্মেন্টসে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেওয়া হয়েছে। বাকিরা যাতে দ্রুত শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করে সেজন্য মনিটরিং করা হচ্ছে। আজকের (মঙ্গলবার) মধ্যে সবার বেতন বোনাস দেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা করছি। আমরা শ্রমিকদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করতে চাই।

বেতন ইস্যুতে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘এখন পোশাকশিল্প কঠিন সময় পার করছে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে এখনো কারখানাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। তা ছাড়া বিশ্বব্যাপী পোশাকের খুচরা দাম কমে গেছে। তাই অর্ডার আগের তুলনায় অনেক কম। এমন সময়ে দ্বিতীয় ঢেউ বিশাল ধাক্কা। হাজারো সমস্যা সত্ত্বেও ৯০ ভাগ কারখানায় এপ্রিল মাসের বেতন এবং ৯২ শতাংশ কারখানায় বোনাস দেওয়া হয়েছে। কিছু কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। সেগুলো নজরে রেখে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

শিল্প পুলিশের জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানাগুলো বেতন-বোনাস দেওয়ায় পিছিয়ে আছে। মোট ৮১৬টি কারখানার মধ্যে ৪১০টিতে বেতন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক কারখানায় বেতন দেওয়া হয়নি। অবশ্য বোনাস দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫০ কারখানায়। উল্টো চিত্র বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানার। এক হাজার ৬৪৩টি কারখানার মধ্যে বেতন বাকি আছে ৩৭৪টিতে। আর বোনাস বাকি ৫৫৮টি কারখানার।

শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার বলেন, ‘সবসময় দেখেছি বিজিএমইএ মনগড়া তথ্য দেয়। তাদের তথ্য সঠিক নয়। এখনো প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কারখানায় বেতন হয়নি; বোনাস হয়নি প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ কারখানায়। ছোট-মাঝারি কারখানাগুলোর কথাতো বাদই দিলাম। যখন পরিস্থিতি ভালো দেখে, তখন ছোট-মাঝারি কারখানাগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে বিজিএমইএ। আর পরিস্থিতি খারাপ দেখলে বলে ওগুলো আমাদের সমস্যা না। তা হলে এ শ্রমিকদের দেখবে কে?’ বাবুল আক্তার মালিকদের প্রতি জোর অনুরোধ করেন, তারা যেন আজকের মধ্যে শ্রমিকদের সব পাওনাদি পরিশোধ করে দেন। তিনি আরও বলেন, মালিকরা সরকারের কাছে যেতে পারে, নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেন; কিন্তু শ্রমিকরা কার কাছে যাবে? তাদের তো কারখানার মালিক ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে নিটওয়্যার পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমাদের সময়কে বলেন, ‘আশা করি শতভাগ কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ হবে। কারখানা মালিকদের জোরালোভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। আমাদের সদস্য কারখানাগুলোর ৯৫ শতাংশ বোনাস-বেতন পরিশোধ করেছে। কাল (আজ মঙ্গলবার) শতভাগ কারখানায় বেতন-বোনাস দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অসন্তোষের খবর আসেনি। একটি কারখানায় সমস্যা হতে পারে। মালিক কারখানা তালা মেরে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। ওই মালিককে খুঁজে বের করতে পুলিশের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।’

শ্রমিক নেতা জলি তালুকদার বলেন, ‘আমাদের কাছে এখনো সঠিক তথ্য আসেনি। আজকে বোঝা যাবে। ঈদের আগে মালিকরা সবসময় গোঁজামিলের আশ্রয় নেন। শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত সময় নেন যাতে শেষ দিন কিছু না করা যায়। শেষ দিনে বেতন-বোনাস পরিশোধ না করেই কারখানা বন্ধ করে দেন, যাতে পরের দিন কেউ বলতে না পারে। মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানাই- তারা যেন আজকের মধ্যে পাওনাদি পরিশোধ করে দেন।’

গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, ‘মহামারীর মধ্যে শ্রমিকরা অনেক কষ্টে আছেন। অনেক কারখানায় কাজ কমেছে। ওভারটাইম না থাকায় আয় কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বেতন-বোনাসটুকুই তাদের সম্বল। অথচ অনেক কারখানাই এখনো বেতন-বোনাস পরিশোধ করেনি- এটা দুঃখজনক। অনেক বড় কারখানার মালিকরাও এখনো বেতন-বোনাস পরিশোধ করেননি। তারা আজকের দিন পর্যন্ত সময় নিয়েছে। তবে বড়দের ধরা গেলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে এখনো বেতন-বোনাস কিছুই হয়নি। তারা আদৌ দিতে পারবে কিনা- এ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। তাদের দেখার কেউ নেই। মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানাই- তারা যেন আজকের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধ করে দেন। নইলে উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য শ্রমিকরা দায়ী থাকবেন না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *