আবুল কাশেম. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড:


বাংলাদেশের আর্থিক খাত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে মনে করে ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড (আইএমএফ)। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণেই এই ঝুঁকি বলে প্রতিষ্ঠানটির খসড়া ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ ২০২০’-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতের খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করে, বাস্তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়েও অনেক বেশি।

বড় বড় গ্রাহকের বারবার খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের (রিশিডিউলিং) সুবিধা দেওয়া ও উচ্চ আদালত থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে ঋণখেলাপিদের বাড়তি সুবিধা প্রাপ্তি বন্ধ করতে বলেছে আইএমএফ। ওয়েল কানেক্টেড কয়েকটি বিশেষ গ্রুপকে অনেক বেশি ঋণ দেওয়ার কারণেও সামগ্রিক আর্থিক খাতে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করে আইএমএফ।

আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইএমএম ফাইন্যান্সিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে সরকারকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

মতামতের জন্য রিপোর্টটি গত সেপ্টেম্বরে আইএমএফ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছে। রিপোর্টে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে সেগুলো সম্পর্কে সংস্থাটির কাছে বাংলাদেশের অবস্থান ও মতামত পাঠানোর জন্য গত বৃহস্পতিবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল সভা করে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

সভায় আইএমএফের রিপোর্টে চিহ্নিত আমলে নেওয়ার মতো কিছু ঝূঁকি দূর করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে মত দেন অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে আইএমএফের পর্যালোচনার বেশিরভাগের সঙ্গেই বাংলাদেশ একমত নয় বলে সভাসূত্রে জানা গেছে। ফাইন্যান্সিয়াল কাউন্সিল গঠনে আইএমএফের প্রস্তাবও সভায় নাকচ করে দেওয়া হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেছেন, ‘চিহ্নিত ঝূঁকি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। ঝাড় দিয়ে ময়লা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রেখে কোনো লাভ নেই। দেশ যেভাবে এগুচ্ছে, ব্যাংকখাত সেভাবে না এগুলে সংকট বাড়বে।’

অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার সভায় বলেন, ‘আইএমএফ আমাদের আর্থিক খাতের বেশকিছু দুর্বল পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে। এগুলো দূর করতে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। আজ-কালের মধ্যেই আইএমএফকে তাদের রিপোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জবাব পাঠাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’

আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ

অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অটোনোমাস ক্যাপাসিটি ও সুপারভাইজারি অ্যাকশনে ঘাটতি আছে। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর ওপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের খবরদারি সমালোচনা করে আইএমএফ এসব ব্যাংকের মালিকানা ও সুপারভিশন আলাদা করার তাগিদ দিয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোকে কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক- এই দুইভাগে ভাগ করতে বলেছে।

আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোতে ইন্ডিপেনডেন্ট পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং স্কিমগুলোকে পৃথক কোনো ডেভেলপমেন্ট বা ফিসক্যাল এজেন্সির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল গঠন এবং রিয়েল এস্টেট সেক্টরের মর্টগেজ পরিস্থিতি নিয়মিত নিবিড় পর্যালোচনায় রাখতে ন্যাশনাল রিয়েল এস্টেট টাস্কফোর্স গঠন করতে বলেছে আইএমএফ।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সিং প্রসেসিংয়ে ত্রুটি, জমি বন্ধক ছাড়া কৃষিঋণ দেয়া, ব্যাংকের ডাটা কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

উল্লেখ্য, গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আইএমএফ-এর সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ রিপোর্টে ঐ বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের প্রকৃত খেলাপি ঋণ বা প্রবলেম এসেট ২,৪০,১৬৭ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করেছিল। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১,১২,৪২৫ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত খেলাপি ঋণের তথ্যের সঙ্গে পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া ঋণ, আদালতের রায়ে স্থগিতাদেশ পাওয়া খেলাপি ঋণ ও স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টে থাকা ঋণগুলোকে যুক্ত করে প্রবলেম এসেটের পরিমাণ তৈরি করে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ কতটা আমলে নিচ্ছে বাংলাদেশ?

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সভায় বলা হয়, খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার অভিযোগ সঠিক নয়। সংকটের সময় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে বড় গ্রাহকদের ঋণ পুনঃগঠন সুবিধা দেওয়া হয়। এতে কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঋণ ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফকে জানাবে।

ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল গঠন এবং জমি বন্ধক রাখা ছাড়াও কৃষিখাতে ঋণ দেওয়া এবং ব্যাংকগুলোর ডাটা কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনে যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

সভায় বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজ উদ্যোগে আর্থিক খাতের ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা দূর করতে নেওয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরে আইএমএফকে বলবে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বড় বড় গ্রাহকদের  ব্যালেন্সশিট পর্যালোচনা করে নিয়মিত ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা দূর করার পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও আইএমএফকে জানানো হবে।

মর্টগেজ মার্কেট থেকে বৈশ্বিক আর্থিক সংকট অতীত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আইএমএফ বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট সেক্টরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও তার সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণে ন্যাশনাল রিয়েল এস্টেট টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেছে। সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা টাস্কফোর্স গঠনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট সেক্টর নিয়ে এমন কোনো ঝুঁকি নেই।

আর্থিক খাতের ঝুঁকি দূর করতে ২৮টি ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি ক্ষেত্রে সহায়তা নিতে পারে বলে সভায় জানানো হয়।

সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘ঝুঁকি কমানো ও আর্থিক খাতে সুশাসন আনতে আমরা ১৩টি আইন সংশোধন নিয়ে কাজ করছি। আইনগুলো সংশোধন হয়ে গেলে ব্যাংকখাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’

‘আর্থিক খাতের বড় সমস্যা এসেট কোয়ালিটি’

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, ‘এই খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এসেট কোয়ালিটি। রিপোর্টেড নন-পারফর্মিং লোন এবং ডিসট্রেসড এসেট যোগ করলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘ডিসট্রেসড এসেট সৃষ্টির বড় কারণ- রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ ও আদায় করে থাকে। ব্যাংকগুলোতে প্রুডেনশিয়াল করপোরেট প্র্যাকটিসের অভাব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশনের ঘাটতির কারণে এটি বছরের পর বছর ধরে আসছে।’

ড. হোসেন বলেন, ‘খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিল সুবিধা ও কোভিড পরিস্থিতির কারণে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি না দিলেও কেউ খেলাপি হচ্ছে না। কোভিডে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হয়েছে। তাই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃতরাও খেলাপি হবেন। এখন মোরাটোরিয়াম পিরিয়ডের কারণে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু যখন মোরাটোরিয়াম থাকবে না, তখন খেলাপি ঋণের পুঁঞ্জিভূত আকার অনেক বড় হয়ে সামনে আসবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ টিবিএসকে বলেন, ‘ওভার দ্য ইয়ার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভালো করার চেষ্টা ছিল, যা এখন আর নেই। ব্যাংকখাতে সুশাসনের অভাব আছে। খেলাপি ঋণও বাড়ছে। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং ও সুপারভিশনের ঘাটতিই এর জন্য দায়ী।’

খেলাপি ঋণ ‘লুকিয়ে রাখা’ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগই সাজিয়ে-গুছিয়ে খেলাপি ঋণের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়। সেসব তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যাচাই করা উচিত। খেলাপি ঋণের তথ্যের জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঠিক নয়।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর টিবিএসকে বলেন, ‘আইএমএফ যেসব সমস্যার কথা বলছে, তা আগে থেকেই চিহ্নিত। সবগুলোই যৌক্তিক। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ লুকানো হচ্ছে রিসিডিউল করে। আইএমএফের হিসাবে রিসিডিউল করা ঋণের সঙ্গে মামলায় আটকে থাকা খেলাপি এবং অন্যান্য ডিসট্রেসড এসেটও যোগ করা হয়। কোভিডের আগে বাংলাদেশে এটি ছিল মোট বিতরণ করা ঋণের ২৩ থেকে ২৫ শতাংশের মতো।’

রিয়েল এস্টেট থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং এজন্য টাস্কফোর্স গঠন সম্পর্কে চানতে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রিয়েল সেক্টরের চেয়ে বেশি চিন্তা করা উচিত নন ব্যাংক ফাইনান্সিয়াল ইনস্টিটিউটগুলো (এনবিএফআই) নিয়ে। ৩-৪টা এনবিএফআই বাদে বাকিগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।’

তিনি এনবিএফআইগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য একটি অর্থবহ টাস্কফোর্স গঠন ও সেটার সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রিয়েল এস্টেট খাতের জন্য ২০-৩০ বছর মেয়াদি বন্ড থাকা দরকার। টাস্কফোর্স গঠন করে এটি চালু করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে বাকি ৯০ শতাংশ অর্থ বন্ডের মাধ্যমে ২০-৩০ বছর মেয়াদে ঋণ নিতে পারে। এ সুবিধার কারণে ওই দেশে কেউ চাকরিতে ঢুকেই বা ব্যবসার শুরুতেই বাড়ি-ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন।’

বাংলাদেশের আর্থিক খাত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে মনে করে ইন্টারন্যাশনাল মনিটরি ফান্ড (আইএমএফ)। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণেই এই ঝুঁকি বলে প্রতিষ্ঠানটির খসড়া ‘ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ ২০২০’-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক খাতের খেলাপি ঋণের যে তথ্য প্রকাশ করে, বাস্তবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ তার চেয়েও অনেক বেশি।

বড় বড় গ্রাহকের বারবার খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের (রিশিডিউলিং) সুবিধা দেওয়া ও উচ্চ আদালত থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে ঋণখেলাপিদের বাড়তি সুবিধা প্রাপ্তি বন্ধ করতে বলেছে আইএমএফ। ওয়েল কানেক্টেড কয়েকটি বিশেষ গ্রুপকে অনেক বেশি ঋণ দেওয়ার কারণেও সামগ্রিক আর্থিক খাতে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করে আইএমএফ।

আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইএমএম ফাইন্যান্সিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে সরকারকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

মতামতের জন্য রিপোর্টটি গত সেপ্টেম্বরে আইএমএফ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠিয়েছে। রিপোর্টে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ পর্যালোচনা করে সেগুলো সম্পর্কে সংস্থাটির কাছে বাংলাদেশের অবস্থান ও মতামত পাঠানোর জন্য গত বৃহস্পতিবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল সভা করে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

সভায় আইএমএফের রিপোর্টে চিহ্নিত আমলে নেওয়ার মতো কিছু ঝূঁকি দূর করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার পক্ষে মত দেন অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে আইএমএফের পর্যালোচনার বেশিরভাগের সঙ্গেই বাংলাদেশ একমত নয় বলে সভাসূত্রে জানা গেছে। ফাইন্যান্সিয়াল কাউন্সিল গঠনে আইএমএফের প্রস্তাবও সভায় নাকচ করে দেওয়া হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেছেন, ‘চিহ্নিত ঝূঁকি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। ঝাড় দিয়ে ময়লা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রেখে কোনো লাভ নেই। দেশ যেভাবে এগুচ্ছে, ব্যাংকখাত সেভাবে না এগুলে সংকট বাড়বে।’

অর্থবিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার সভায় বলেন, ‘আইএমএফ আমাদের আর্থিক খাতের বেশকিছু দুর্বল পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে। এগুলো দূর করতে উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার। আজ-কালের মধ্যেই আইএমএফকে তাদের রিপোর্টের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জবাব পাঠাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।’

আর্থিক খাতের ঝুঁকি নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ

অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ মনে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অটোনোমাস ক্যাপাসিটি ও সুপারভাইজারি অ্যাকশনে ঘাটতি আছে। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর ওপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের খবরদারি সমালোচনা করে আইএমএফ এসব ব্যাংকের মালিকানা ও সুপারভিশন আলাদা করার তাগিদ দিয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোকে কমার্শিয়াল ব্যাংক ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক- এই দুইভাগে ভাগ করতে বলেছে।

আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোতে ইন্ডিপেনডেন্ট পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং স্কিমগুলোকে পৃথক কোনো ডেভেলপমেন্ট বা ফিসক্যাল এজেন্সির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল গঠন এবং রিয়েল এস্টেট সেক্টরের মর্টগেজ পরিস্থিতি নিয়মিত নিবিড় পর্যালোচনায় রাখতে ন্যাশনাল রিয়েল এস্টেট টাস্কফোর্স গঠন করতে বলেছে আইএমএফ।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সিং প্রসেসিংয়ে ত্রুটি, জমি বন্ধক ছাড়া কৃষিঋণ দেয়া, ব্যাংকের ডাটা কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

উল্লেখ্য, গত বছর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আইএমএফ-এর সর্বশেষ ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্ট্যাবিলিটি রিভিউ রিপোর্টে ঐ বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের প্রকৃত খেলাপি ঋণ বা প্রবলেম এসেট ২,৪০,১৬৭ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করেছিল। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১,১২,৪২৫ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত খেলাপি ঋণের তথ্যের সঙ্গে পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া ঋণ, আদালতের রায়ে স্থগিতাদেশ পাওয়া খেলাপি ঋণ ও স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টে থাকা ঋণগুলোকে যুক্ত করে প্রবলেম এসেটের পরিমাণ তৈরি করে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ কতটা আমলে নিচ্ছে বাংলাদেশ?

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সভায় বলা হয়, খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখার অভিযোগ সঠিক নয়। সংকটের সময় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে বড় গ্রাহকদের ঋণ পুনঃগঠন সুবিধা দেওয়া হয়। এতে কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঋণ ফেরত পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফকে জানাবে।

ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি কাউন্সিল গঠন এবং জমি বন্ধক রাখা ছাড়াও কৃষিখাতে ঋণ দেওয়া এবং ব্যাংকগুলোর ডাটা কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনে যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

সভায় বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজ উদ্যোগে আর্থিক খাতের ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা দূর করতে নেওয়া নানা পদক্ষেপ তুলে ধরে আইএমএফকে বলবে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোর ব্যাপারে সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বড় বড় গ্রাহকদের  ব্যালেন্সশিট পর্যালোচনা করে নিয়মিত ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা দূর করার পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও আইএমএফকে জানানো হবে।

মর্টগেজ মার্কেট থেকে বৈশ্বিক আর্থিক সংকট অতীত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আইএমএফ বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট সেক্টরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও তার সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণে ন্যাশনাল রিয়েল এস্টেট টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেছে। সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা টাস্কফোর্স গঠনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট সেক্টর নিয়ে এমন কোনো ঝুঁকি নেই।

আর্থিক খাতের ঝুঁকি দূর করতে ২৮টি ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি ক্ষেত্রে সহায়তা নিতে পারে বলে সভায় জানানো হয়।

সভায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘ঝুঁকি কমানো ও আর্থিক খাতে সুশাসন আনতে আমরা ১৩টি আইন সংশোধন নিয়ে কাজ করছি। আইনগুলো সংশোধন হয়ে গেলে ব্যাংকখাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’

‘আর্থিক খাতের বড় সমস্যা এসেট কোয়ালিটি’

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, ‘এই খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এসেট কোয়ালিটি। রিপোর্টেড নন-পারফর্মিং লোন এবং ডিসট্রেসড এসেট যোগ করলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘ডিসট্রেসড এসেট সৃষ্টির বড় কারণ- রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ ও আদায় করে থাকে। ব্যাংকগুলোতে প্রুডেনশিয়াল করপোরেট প্র্যাকটিসের অভাব ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভিশনের ঘাটতির কারণে এটি বছরের পর বছর ধরে আসছে।’

ড. হোসেন বলেন, ‘খেলাপি ঋণের পুনঃতফসিল সুবিধা ও কোভিড পরিস্থিতির কারণে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের কিস্তি না দিলেও কেউ খেলাপি হচ্ছে না। কোভিডে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ হয়েছে। তাই ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃতরাও খেলাপি হবেন। এখন মোরাটোরিয়াম পিরিয়ডের কারণে খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু যখন মোরাটোরিয়াম থাকবে না, তখন খেলাপি ঋণের পুঁঞ্জিভূত আকার অনেক বড় হয়ে সামনে আসবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ টিবিএসকে বলেন, ‘ওভার দ্য ইয়ার ব্যাংকগুলোর মধ্যে ভালো করার চেষ্টা ছিল, যা এখন আর নেই। ব্যাংকখাতে সুশাসনের অভাব আছে। খেলাপি ঋণও বাড়ছে। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং ও সুপারভিশনের ঘাটতিই এর জন্য দায়ী।’

খেলাপি ঋণ ‘লুকিয়ে রাখা’ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগই সাজিয়ে-গুছিয়ে খেলাপি ঋণের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায়। সেসব তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যাচাই করা উচিত। খেলাপি ঋণের তথ্যের জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা ঠিক নয়।’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর টিবিএসকে বলেন, ‘আইএমএফ যেসব সমস্যার কথা বলছে, তা আগে থেকেই চিহ্নিত। সবগুলোই যৌক্তিক। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম নেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ লুকানো হচ্ছে রিসিডিউল করে। আইএমএফের হিসাবে রিসিডিউল করা ঋণের সঙ্গে মামলায় আটকে থাকা খেলাপি এবং অন্যান্য ডিসট্রেসড এসেটও যোগ করা হয়। কোভিডের আগে বাংলাদেশে এটি ছিল মোট বিতরণ করা ঋণের ২৩ থেকে ২৫ শতাংশের মতো।’

রিয়েল এস্টেট থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং এজন্য টাস্কফোর্স গঠন সম্পর্কে চানতে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রিয়েল সেক্টরের চেয়ে বেশি চিন্তা করা উচিত নন ব্যাংক ফাইনান্সিয়াল ইনস্টিটিউটগুলো (এনবিএফআই) নিয়ে। ৩-৪টা এনবিএফআই বাদে বাকিগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।’

তিনি এনবিএফআইগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে তা দূর করার জন্য একটি অর্থবহ টাস্কফোর্স গঠন ও সেটার সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রিয়েল এস্টেট খাতের জন্য ২০-৩০ বছর মেয়াদি বন্ড থাকা দরকার। টাস্কফোর্স গঠন করে এটি চালু করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ১০ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে বাকি ৯০ শতাংশ অর্থ বন্ডের মাধ্যমে ২০-৩০ বছর মেয়াদে ঋণ নিতে পারে। এ সুবিধার কারণে ওই দেশে কেউ চাকরিতে ঢুকেই বা ব্যবসার শুরুতেই বাড়ি-ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারেন।’

অনুরূপ:-দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *