শামীম হোসেন সাভার:

সাভারের এক কৃষক গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার একটি মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এক’শ দিন বিনা অপরাধে কারা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিনা অপরাধে কারাভোগ করা ওই ব্যক্তি সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়নের ফিরিঙ্গীকান্দা গ্রামের গেদু মিয়ার ছেলে কৃষক আজিজুর রহমান ওরফে আবদুল আজিজ। ৮ টি মামলার ভুয়া পরোয়ানায় তাঁকে ১০০ দিন জেলে থাকতে হয়। ওই কৃষক নিজের বসত বাড়ি ঘর অন্যের কাছে বন্ধক রেখে বর্তমানে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন।

বন্ধ হয়ে গেছে দুই সন্তানের পড়া লেখা। সোমবার সকালে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি বিনা অপরাধে কারা ভোগ করার কথা বলেন।

জয়দেবপুর থানায় করা মাদকের মামলায় ২০১৭ সালের ৬ মার্চ আজিজুর রহমানকে পুলিশ তাঁর বাড়ি

ফিরিঙ্গীকান্দা গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। সেই সময় গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক জামাল উদ্দিন এই মামলা করেছিলেন।

তখনকার মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুর থানার পুবাইল তালুটিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে ৪০০টি ইয়াবা ট্যাবলেটসহ রিপা ও আমেনা নামের দুই মাদক ব্যবসায়ীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আজিজসহ নয়জন পালিয়ে যান। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে সোপর্দ করে। শুনানি শেষে আদালত তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেন।

কয়েক দিন সেখানে থাকার পর তাঁকে গাজীপুর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। এর তিন দিন পর সেখান থেকে পাঠানো হয় কাশিমপুর কারাগারে।

নথিতে দেখা যায়, কাশিমপুর কারগারে থাকা অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার চারটি মামলায়, রাজধানীর মিরপুর থানার একটি মামলায়, জামালপুরের বক্সীগঞ্জ থানার একটি মামলায় ও মাদারীপুর সদর থানার একটি মামলায় পরোয়ানার মাধ্যমে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এসব মামলায় তাঁকে চট্টগ্রাম কারাগার, মাদারীপুর কারাগার ও জামালপুর কারাগারে থাকতে হয়। সর্বশেষ তিনি ছিলেন কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

চট্টগ্রাম মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ তৃতীয় আদালতের বিচারক বিলকিছ আক্তার গত বছর ২৯ মে এক আদেশে বলেন, চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার মামলায় আজিজুর রহমান ওরফে আবদুল আজিজ নামে কোনো আসামি নেই।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আজিজুরের অন্তবর্তীকালীন হাজতি পরোয়ানার ফটোকপিতে শুধু দায়রা নম্বর ছাড়া আর কোনো কিছুর মিল নেই এবং আদালত (চট্টগ্রাম মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ তৃতীয় আদালত) থেকে তাঁর নামে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়নি। অন্য কোনো মামলায় আটকাদেশ না থাকলে তাঁকে (আজিজুর) মুক্তির নির্দেশ দেন আদালত।

মাদারীপুর মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালত গত বছরের ৩১ মে এক আদেশে বলেন, আবদুল আজিজকে (আজিজুর রহমান) হয়রানির জন্য বিচারক ও আদালতের সিল-স্বাক্ষর জাল করে মাদারীপুর সদর থানার একটি মামলায় তাঁর নামে হাজতি পরোয়ানাসহ এক পাতার আদেশনামা তৈরি করা হয়েছে। আদালতে উপস্থাপন করা ওই আদেশনামায় অনেক অসংগতি আছে বলে আদালত উল্লেখ করেন।

আদালত আজিজুর রহমানের ওই পরোয়ানা বাতিল ও অকার্যকর সাব্যস্ত করে অন্য কোনো মামলায় আটকাদেশ না থাকলে মাদারীপুর সদর থানার মামলাতেও তাঁকে মুক্তির আদেশ দেন।

এবিষয়ে আজিজুর রহমান বলেন, কোনো একটি মহল ভুয়া পরোয়ানা তৈরি করে তাঁকে হয়রানি করেছেন। কিন্তু সব কটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ভুয়া বলে প্রমাণিত হলে আদালত ওই সব মামলা থেকে তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন।

আদালতের নির্দেশে ১০০ দিন হাজত খাটার পর ২০১৭ সালের ১২ জুন তিনি মুক্তি পান। ছাড়া পেয়ে হয়রানির প্রতিকার চেয়ে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন তিনি। এত দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো জবাব পাননি। তিনি আরো বলেন, আদালতের নির্দেশে আটটি মামলা থেকে তিনি মুক্তি পেলেও গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার মাদকের মামলায় তিনি এখনো হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন।

ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মাদকের মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানান তিনি। বিষয়টি তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এবিষয়ে তৎকালীন গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক জামাল উদ্দিন এবিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *