টাঙ্গাইল প্রতিনিধি:
সেচ মেশিনে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য পাঁচ বছর আগে আবেদন করেছিলেন শ্যামলা বেগম নামে এক বৃদ্ধা। দূরত্বের কারণ দেখিয়ে আজ পর্যন্ত বসানো হয়নি কোনো বৈদ্যুতিক খুঁটি। তারও টাঙানো হয়নি। দেওয়া হয়নি বিদুৎ সংযোগ। এতদিন পর হঠাৎ তার নামে বিল এসেছে প্রায় সোয়া লাখ টাকা!

আবার এ ভুতুড়ে বিল খেলাপির দায়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অধীনে টাঙ্গাইলের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ কর্তৃপক্ষ মামলা দিয়েছে শ্যামলা বেগমের বিরুদ্ধে।

এ মামলায় আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর বিবাদী শ্যামলা বেগমকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের এমন কার্যক্রমে এলাকাবাসীর মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।

গত রবিবার বিকালে ভুক্তভোগী শ্যামলা বেগমের পক্ষে স্থানীয় এলাকাবাসী মানববন্ধন করে এর প্রতিবাদ জানান। এ সময় দুই শতাধিক মানুষ মানববন্ধনে অংশ নেন। তারা দ্রুত এ মিথ্যা বিল ও ভিত্তিহীন মামলা থেকে শ্যামলা বেগমকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।

জানা যায়, শ্যামলা বেগম বাসাইল উপজেলার কাশিল ইউনিয়নের দাপনাজোর হাকিমপুর গ্রামের মৃত আবদুল সবুর মিয়ার স্ত্রী। সেচ মেশিনে বিদ্যুৎ লাইন নেওয়ার জন্য ২০১৪ সালের শেষের দিকে তিনি বাসাইল পৌর এলাকার মশিউর রহমান নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে পিডিবি টাঙ্গাইলের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ ১-এর অধীনে আবেদন করেন।

ওই সময় দাপনাজোর হাকিমপুর, দেউলী ও মুড়াকৈ এলাকার ১২ জনের কাছ থেকে সেচ মেশিনে বিদ্যুতের লাইন পাইয়ে দিতে স্থানীয় শফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে মশিউর ১১ লাখ টাকা নেন। পরে ২০১৫ সালের প্রথম দিকে ১১ জনের সেচ মেশিনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। ওই সময় দূরত্বের কারণ দেখিয়ে শ্যামলা বেগমের লাইন না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা কাজ শেষ করে চলে যান।

আবেদনের প্রায় পাঁচ বছর পর সম্প্রতি শ্যামলা বেগমের নামে এক লাখ ১৪ হাজার ৬২৭ টাকা বিদ্যুৎ বিল দেখিয়ে আদালতে মামলা করা হয়েছে। টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তরের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ (বিউবো) এর সহকারী প্রকৌশলী মো. সাইমুম শিবলী বাদী হয়ে টাঙ্গাইলের ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) বিদ্যুৎ আদালতে মামলাটি করেন। ফলে নিরীহ শ্যামলা বেগম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

সরেজমিন গেলে ভুক্তভোগী শ্যামলা বেগম বলেন, ‘আমরা ১২ জন সেচ মেশিনে বিদ্যুতের লাইনের জন্য আবেদন করলে লাইন পাইয়ে দিতে স্থানীয় শফিকুলের মাধ্যমে মশিউর রহমান সেচপ্রতি ৮০ হাজার করে টাকা নেন। ওই সময় ১১ জন বিদ্যুৎ লাইন পেলেও আমাকে লাইন দেওয়া হয়নি।

খুঁটি বসানো ও তারও টাঙানো হয়নি। আমার ৮০ হাজার টাকাও ফেরত দেয়নি। উল্টো আমার নামে এক লাখ ১৪ হাজার ৬২৭ টাকা বিদ্যুৎ বিল এসেছে। এ ছাড়া আমার নামে তারা মামলাও করেছে। বিদ্যুৎ অফিসের এমন মিথ্যা মামলায় এই বৃদ্ধ বয়সে আমাকে আদালতে দাঁড়াতে হবে। এমনকি বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও বিল খেলাপির অপবাদে জেলেও যেতে হতে পারে।

এ ব্যাপারে আমি কী করব বুঝতে পারছি না। এমন হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা থেকে মুক্তি পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মহসিনুজ্জামান বলেন, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ খুঁটি স্থাপন বা কোনো তারও টাঙায়নি, সংযোগও দেয়নি। তার পরও শ্যামলা বেগমের নামে বিদ্যুৎ বিল খেলাপি মামলা হয়েছে। এই মামলা থেকে বৃদ্ধাকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলাম বলেন, উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে একটি চক্রের মাধ্যমে পিডিবি ভুয়া লাইন দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে। আর শ্যামলা বেগমের বিষয়টি আমি টাঙ্গাইলের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত আলীর কাছে ফোনে জানতে চাই। তিনি আমাকে বলেন, ‘আপনি আমাকে ফোন দিয়েছেন কেন?’ তখন তাকে বলেছি- আমি উপজেলা চেয়ারম্যান, আমার জনগণ সমস্যায় পড়লে আমার কাছে আসবে, আমি তখন সমাধানের চেষ্টা করব।

তখন তিনি আবার বলেন- ‘আপনি আমাকে ফোন দিতে পারেন না, আপনার কোনো কথা থাকলে অফিসে এসে বলবেন।’ এ কথার জবাবে আমি তাকে বলেছি- জনগণের নামে মিথ্যা বিল দেবেন, মামলা দেবেন, হয়রানি করবেন। আমি আপনাকে কেন ফোন দিতে পারব না?

বিদ্যুৎ লাইন পাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে টাকা লেনদেনকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালের শেষের দিকে আমার নিজের একটিসহ ১২টি সেচ মেশিনে বিদ্যুৎ লাইনের জন্য আবেদন করে ইস্টিমেট করি। তখন আমার হাত দিয়েই ১২টি সেচের জন্য মশিউর রহমানকে ১১ লাখ টাকা দিই।

সেই সময় ১১টি সেচে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু শ্যামলা বেগমের সেচ পয়েন্ট পর্যন্ত কোনো প্রকার খুঁটি স্থাপন বা তার টাঙানোই হয়নি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি। তারা বলেন, এ লাইন বাতিল হয়ে গেছে। এ পাঁচ বছর শ্যামলা বেগমের নামে কোনো বিদ্যুৎ বিলও আসেনি। হঠাৎ করেই বিল বকেয়াসংক্রান্ত বিদ্যুৎ বিভাগের মামলার সমন এসেছে।

এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ লাইন পাইয়ে দিতে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়ে টাকা গ্রহণকারী মশিউর রহমান বলেন, ওই এলাকায় ১১টি সেচে বিদ্যুৎ লাইন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শ্যামলা বেগমের লাইনটি বাতিল হলে অফিসকে অবহিত করা হয়েছিল। অফিসকে অবহিত করার পর তার নামে বিল আসার কথা না। কেন বিল এলো, মামলা হলো- এটি বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তারাই ভালো জানেন।

মামলার বাদী টাঙ্গাইলের নির্বাহী প্রকৌশলী দপ্তরের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ ১-এর সহকারী প্রকৌশলী মো. সাইমুম শিবলীর কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোবাইলে কথা বলা যাবে না। অফিসে আসেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ রকম হাজার হাজার মামলা হচ্ছে।’ পরে তিনি ফোন কেটে দেন।

টাঙ্গাইলের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ ১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত আলী বলেন, ‘মামলা হয়েছে কিনা বা কেন হলো, আমি কীভাবে বলব?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *