নিজস্ব প্রতিবেদক:


২২ ডিসেম্বর ২০১৬। স্থানীয় সময় তখন রাত তিনটা। ওমানের মাসকাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেড় শতাধিক আরোহী নিয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো আকাশে ডানা মেলে বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। পাইলটের আসনে বিচক্ষণ এক ক্যাপ্টেন। নাম নওশাদ আতাউল কাইয়ুম।

বিমান যখন মাঝ আকাশে তখন মাসকাট বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারের সতর্কবার্তা-‘রানওয়ে থেকে বিমানের টায়ারের কিছু অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের ধারণা এটি মাত্রই টেক অফ করা বাংলাদেশ বিমানের অংশবিশেষ। ১৮ টন জ্বালানি আর উড়োজাহাজটির ওজন ৬০ টন। সব মিলিয়ে ৭৮টন ওজনের বিশাল উড়োজাহাজ। একটু এদিক সেদিক হলেই ঘটতে পারে বিস্ফোরণ।

তবে এর কোনো কিছুই ঘটেনি সেদিন। পাইলট নওশাদের বুদ্ধিমত্তা আর বিচক্ষণতায় বিমান অবতরণ করে নিরাপদে। প্রাণে বাঁচে সবাই। তবে অবতরণের পর বিমানের চাকা দেখে বিস্মিত হন উপস্থিত সবাই। বাহবা দেন পাইলট নওশাদকে। কেননা বিমানটি চট্টগ্রামে অবতরণের কথা থাকলেও নওশাদ অবতরণ করান ঢাকায়। আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল জরুরি সেবার সবকটি টিম।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে বৈমানিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশন প্রশংসাপত্রের মাধ্যমে সম্মান জানান নওশাদকে। পরে জানাজানি হয় নওশাদের কৃতিত্ব। জাতীয় বীরের আসনে অধিষ্ঠিত হয় তিনি।

২৭ আগস্ট ২০২১। পাঁচ বছর পর একই বিমানবন্দর থেকে ১২৪ জন যাত্রী নিয়ে আবারও গর্জন তুলে বাংলাদেশ বিমান। এবারও পাইলটের আসনে ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বিমান যখন ভারতের সীমানায় মাঝ আকাশে তখনই ঘটলো বিপত্তি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন নওশাদ। এয়ার কন্ট্রোলের দায়িত্ব নেন কো-পাইলট মুস্তাকিম। বিমান জরুরি অবতরণ করা হয় নাগপুরের বাবাসাহেব আম্বেদকর বিমানবন্দরে। আগে থেকেই অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয় নওশাদকে। সেখানে তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হেরে যান ক্যাপ্টেন।

দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনা অকুতোভয় সৈনিক ক্যাপ্টেন নওশাদ শেষবারের মতো দেশে প্রত্যাবর্তন করেন ২ সেপ্টেম্বর। তবে অন্যদিনের মতো নয়। এবারের ফেরাটা ছিল সম্পূর্ণই আলাদা। বাহন ছিল নিজেরই প্রিয় বিমান। যেখানে চালকের আসনে নওশাদের কেটেছে ১৯টি বছর। তবে সেদিন, চালক ছিল অন্য কেউ। অন্য কোনো সহকর্মী। সুদক্ষ বৈমানিক নওশাদ তখন নিথর দেহে কফিনবন্দি।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও বন্ধুরা। বন্ধুর কফিন কাঁধে বহন করেন শোকাহত বন্ধুরাই। তখন হ্যাট নামিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ক্যাপ্টেনরা। জানানো হয় ফুলেল সম্মাননা।

ক্যাপ্টেন নওশাদ ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে এফ-২৮ উড়োজাহাজের ফার্স্ট অফিসার পদে যোগ দেন। সেখান থেকে এয়ারবাস ৩১০তে ফার্স্ট অফিসার পদে পদোন্নতি পান। এরপর ৭৭৭-৩০০ ইআর উড়োজাহাজের ফার্স্ট অফিসার হিসেবে আবারও পদোন্নতি পান। পরবর্তীতে বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে আবারও পদোন্নতি পান নওশাদ। তিনি বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। ছেলে মেয়েরা স্ত্রীর সঙ্গে আমেরিকায় বসবাস করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *