শাহজালাল ভূঁইয়া,ফেনী:

গত ৮ অক্টোবর রাতে শহরের পাঠানবাড়ী এলাকার সফিকুর রহমান সড়কের তাসফিয়া ভবনে ঘটে যাওয়া বাবু হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেফতার ভবন কেয়ারটেকার মোজাম্মেল হক শাহীন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মো: জাকির হোসেন এর আদালতে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য গুলো প্রকাশ করে।

শাহীন জানায়, একেকজনের বাড়ি একেক উপজেলায়। কারো বাড়ি ফুলগাজী, পরিচয় ফেসবুকেই। ফেসবুকের চ্যাটিংয়ে চলতো সমকামীতার আলাপ। একপর্যায়ে নিজেদের নামও বদলে ফেলে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী ইউনুছ নবী বাবু ও মাষ্টার্স পাশ করা এসএম মোমেন শাহরিয়ার। বাবুকে ‘মেহেদী’ আর শাহরিয়ারের সাথে ‘ইভান’ নামেই চেনেন মোজাম্মেল হক শাহীন। তার সাথে এ গ্রুপে যোগ দিতো অনেকে সমকামীদের নিয়ে আড্ডা, বসবাস, বেড়ানো সবই করতো।

বুধবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তার ২০ পাতার অধিক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শাহীন আদালতকে জানায়, বাবু, শাহরিয়ার ও রাকিব পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী মোটর সাইকেল নিয়ে তাসফিয়া ভবনে তার কাছে যায়। পথিমধ্যে রাকিব নেমে যায়। পুরাতন রেজিষ্ট্রি অফিস সড়কে তাদের এগিয়ে নিতে আসে সে। এরপর তাকে নিয়ে দুটি স্প্রিড, সিগারেট কেনে শাহরিয়ার। শাহরিয়ার টাকা দিতে চাইলেও তা দেয়নি শাহীন।

এরপর বাসায় ফিরে ভবনের ছাদে বাবুর সাথে সমকামীতা সেরে নিচে চলে আসে তারা। একপর্যায়ে বাবু ঘুমিয়ে পড়ে। কথাকাটাকাটি হলে শাহরিয়ারকে হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে শাহীন। ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে চড়-থাপ্পড় দিলে পুনরায় হাতুড়ি দিয়ে ৫-৬বার আঘাত করে। এতে সে পড়ে গেলে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে। চিৎকারে বাবু ঘুম থেকে জেগে উঠে শাহরিয়ারকে খোঁজাখুজি করলে তাকেও বেশ কয়েকবার হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে শাহীন। এরপর দা দিয়ে কোপাতে থাকে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার গলায় রশি পেচানো হয়। প্রথমে শাহরিয়ারকে সেপটিক ট্যাংকে ফেলা হয়। পরে বাবুকে ফেলা হয়।

সূত্রের ভাষ্যমতে, শাহীন ইতিপূর্বে আরো ৫-৬ জনের সাথে সমকামিতায় লিপ্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। এদের মধ্যে দুইজনের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। চট্টগ্রামে গার্মেন্টেসে চাকুরীরত শাহীন গত সাড়ে ৪ মাস আগে করোনাকালে বিদেশ যেতে চেষ্টা করছিল। এজন্য পাসপোর্টও তৈরি করে। কিন্তু তাতে বিলম্ব হওয়ায় মাদরাসা পড়–য়া ছোট ভাইয়ের সাথে এক সহপাঠির সম্পর্কের সুবাধে তার বাবার মালিকীয় তাসফিয়া ভবনে কেয়ারটেকারের চাকুরী নেয় শাহীন।

জানা গেছে, শাহীন ৬টি ফেসবুক আইডি ব্যবহার করতো। বিয়ে না করলেও ছদ্ম নামের একটি আইডিকে নিজের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতো। এরপর চ্যাটিংয়ে কথাবার্তায় বনিবনা না হলে তার সাথে সম্পর্কের ছেদ ঘটতো। কেউ তার প্রতি আসক্তি হলে প্রলুদ্ধ করতো। এছাড়া একটি আইডি নিজের ও অপর ৪টি ফেক আইডি।

জানা গেছে, বাবু ও শাহরিয়ার একসময় একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী করতো। সেই থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা-বন্ধুত্ব। এরপর বাবু বিএসসি পড়াশোনার জন্য চায়না চলে গেলে ফেসবুকে পরিচয় হয় শাহীনের সাথে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সুদ্বীপ রায় জানান, শাহীন আদালতে ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার আলামত সমূহ ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ফরেনসিকে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। আর কারো সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা ফরেনসিক প্রতিবেদন পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রসঙ্গত; গত ১০ অক্টোবর রাতে পুলিশ ওই ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে বাবুর লাশ উদ্ধার করে। ওইদিনই বাবুর মা বাদী হয়ে মোজাম্মেল হক শাহীন ও ইউনুছ নবী রাকিবের নাম উল্লেখ এবং ৪-৫ জনকে অজ্ঞাত হিসেবে আসামী করে ফেনী মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

আগেরদিন ৯ অক্টোবর ভোরে সেপটিক ট্যাংক থেকে পুলিশ শাহরিয়ারকে মুমুর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ওইদিনই শাহরিয়ারের মা বাদী হয়ে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন। ওইদিনই ভবনের তত্বাবধায়ক শাহীনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। সে দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের দক্ষিন জায়লস্কর গ্রামের মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *