অনলাইন ডেস্ক:
নিতান্ত নিরীহ দর্শন প্লাস্টিক পৃথিবীর প্রাণ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে। সস্তায় উৎপাদিত জীবাশ্ম জ্বালানি তেলের উপজাত থেকে তৈরি করা প্লাস্টিক ব্যবহার হচ্ছে; প্রায় প্রতিটি পণ্যের মোড়ক তৈরি, কোমল পানীয়ের বোতল-সহ অসংখ্য কাজে। আর এভাবেই আমাদের চারপাশে ক্রমশ জমে উঠেছে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তুপ। এ অবস্থা নিরসনে কাজ করে চলা বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আশার কথা শুনিয়েছেন।

তারা সম্প্রতি এমন একটি সুপার-এনজাইম আবিস্কার করেছেন, যা তাদের ইতোপূর্বে উদ্ভাবিত যেকোনো অণুজীবের চাইতে ছয়গুণ দ্রুতগতিতে প্লাস্টিকের তৈরি বোতল খেয়ে ফেলবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এ আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে এক-দুই বছরের মধ্যেই তারা দ্রুতগতির প্লাস্টিক বর্জ্য পুনঃব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন।

এনজাইম একটি প্রোটিন, যা পাওয়া যায় জীব কোষ থেকে। নতুন এনজাইমটি এমন একটি ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবের দেহে পাওয়া গেছে যেটি প্রাকৃতিকভাবেই প্লাস্টিক খেয়ে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করেছিল। অণুজীবের মাধ্যমে এভাবে প্লাস্টিক কণার ক্ষয় হলে, তা পরবর্তীতে রিসাইকেল বা পুনঃব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াজাত করাটাও অনেক সহজ হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানীরা এই ব্যাকটেরিয়ার দেহে তুলাখেকো বৈশিষ্ট্য যোগ করার চেষ্টাও চালাচ্ছেন। তাদের আশা এর ফলে মাইক্রোফাইবার বা অতিসূক্ষ্মকণার আঁশজনিত যে দূষণ ঘটছে, তা বন্ধ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে প্রতিদিন এই ধরনের লাখ লাখ টন বর্জ্য ভূমি ভরাটে ব্যবহৃত হয়, অথবা তা পুড়িয়ে ফেলা হয়।

এমন সময়ে বিজ্ঞানের এ অগ্রগতি আশার আলো জাগাচ্ছে, যখন মানব সভ্যতার অপরিণামদর্শী প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার পুরো পৃথিবীকে দূষিত করে ফেলেছে। হোক তা- উত্তর মেরুর দুর্গম অঞ্চল বা মহাসাগরের গভীর তলদেশ; মানুষের দূষণ থেকে প্লাস্টিক কণা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। নতুন গবেষণাগুলো বলছে, মানবদেহে এখন অতিক্ষুদ্র এ কণা নিঃশ্বাস বা খাদ্যের মাধ্যমে প্রবেশ করছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, পুরোনো প্লাস্টিক বোতলের রাসায়নিক গঠনের কারণে তা থেকে নতুন বোতল তৈরি করা বেশ জটিল। একারণেই প্রতিবছর জীবাশ্ম তেলের উপজাত থেকে নতুন করে বোতল তৈরি করা হচ্ছে।

নতুন সুপার এনজাইমটি দুটি ভিন্ন অণুজীবের কোষে প্রাপ্ত এনজাইমের জৈব-রাসায়নিক গড়ন একত্র করে জৈব-প্রকৌশলের মাধ্যমে গবেষণাগারে তৈরি করা। ২০১৬ সালে জাপানের একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থাপনায় এগুলোর সন্ধান পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে প্রথমবার এদের রূপান্তরিত একটি সংস্করণ তৈরি করেন গবেষকরা, যা মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে প্লাস্টিক কণা ভেঙ্গে ফেলার সক্ষমতা দেখিয়েছিল। তবে, সাম্প্রতিকতম সুপার-এনজাইম তার চাইতেও ছয়গুণ বেশি গতিতে কাজ করে।

পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনজাইম গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ম্যাকগিহান আশা করছেন, সুপার এনজাইমটি বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা কমাতে পারবে। ছবি: ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথ
গবেষণায় জড়িত অন্যতম বিজ্ঞানী এবং যুক্তরাজ্যের পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন ম্যাকগিহান জানান, ‘আমরা এনজাইম দুটির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছি, যার ফলে এর কার্যক্ষমতা অবিশ্বাস্য দ্রুতগতি লাভ করেছে।’

তিনি বলেন, ”গতিশীলতা বাড়ার কারণে এখন শিল্পপর্যায়ে এটি ব্যবহারের প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে গেল। পাশাপাশি সুপার এনজাইমটি আমাদের প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার দিকে প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। গবেষণাগারে আমরা শুধু প্রাকৃতিক উপাদানেরই সফল রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হয়েছি।”

এর আগে গত এপ্রিলে ফরাসি কোম্পানি ক্যারবিওস ভিন্ন একটি এনজাইম তৈরি করেছিল। এটিও প্রাকৃতিক অণুজীবের দেহ থেকে সংগ্রহ করা। গবেষণাগারে রুপান্তরের পর এটি ৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৯০ শতাংশ প্লাস্টিক বোতলের রাসায়নিক গঠন ভেঙ্গে ফেলার সক্ষমতা দেখায়।

সাম্প্রতিকতম সুপার এনজাইম প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী ম্যাকগিহান জানান, ”নানা ধরণের উপায়ের মিশ্র প্রয়োগে বাণিজ্যিকভাবে বৃহৎ আকারে প্লাস্টিক দূষণ কমানোর উদ্যোগ এখন নতুন মাত্রা পাবে। আমরা যদি আরও দ্রুত কাজ করতে সক্ষম এমন একটি এনজাইম বানাতে পারি এবং তার সঙ্গে কারবিওস-এর এনজাইমটির সংযুক্তি ঘটাতে সক্ষম হই; তাহলে খুব শীঘ্রই বা দুই-এক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করার আশা করছি।”

২০১৮ সালে জাপানে পেটাসে- নামক একটি এনজাইমের জৈব-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করা হয়েছিল, যা প্লাস্টিক বোতলের স্বচ্ছ পৃষ্ঠতলে আক্রমণ করে তার ক্ষয় ঘটায়। ওই সময় পরীক্ষাগারে আকস্মিকভাবে মিশ্রিত একটি অভিযোজিত এনজাইম সংস্করণ জাপানি অণুজীবটির দেহে প্রবেশ ঘটানো হলে- তা প্লাস্টিকের রাসায়নিক গড়ন আরও ২০ শতাংশ বেশি দ্রুতগতিতে ক্ষয় করতে সক্ষম হয়।

প্রাকৃতিক আঁশের গড়ন ভাঙ্গতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়াগুলো গত কয়েক লাখ বছরের বিবর্তনে তাদের নতুন দ্বিমুখী সক্ষমতাটি অর্জন করেছে। একারণেই বিজ্ঞানীরা আন্দাজ করেন জীবকোষের এ দুটি প্রোটিন একত্র করা হলে; তা প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষয়ের মাত্রা বহুগুণ বাড়াবে। সে গবেষণাতেই এখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানাচ্ছেন তারা।

গবেষণাগারে তৈরি নতুন ধরনের সুপার এনজাইমটি প্রাকৃতিকভাবে ব্যাকটেরিয়ার দেহে তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। এনজাইমের আণবিক গড়ন অনেক বড় হওয়াতেই এ বিপত্তি। একারণেই গবেষণাগারে একত্র করার মধ্যে দিয়ে বিশ্বকে প্লাস্টিক বর্জ্যের দৌড়াত্ম থেকে বাঁচাতে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন বিজ্ঞানীরা।

পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এ গবেষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সংস্থাও কাজ করেছে। সম্প্রতি এ আবিস্কার সম্পর্কিত নিবন্ধটি বৈজ্ঞানিক জার্নাল- প্রোসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত হয়।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান / টিবিএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *