জেলা প্রতিনিধি,কিশোরগঞ্জ:

কিশোরগঞ্জের ইটনায় বাবার বাড়িতে স্বামীর পাশে ঘুমন্ত অবস্থায় আকলিমা আক্তার (২০) নামে এক গৃহবধূকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে হত্যা রহস্যের জট খুলেছে। পুলিশের কৌশলী তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ঘটনার আদ্যোপান্ত। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর হত্যাকারী আপন বড় ভাই মোতাহার (৩০) বোন হত্যার নৃশংস বর্ণনা দিয়েছেন।

প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে আদরের ছোটবোনকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে সে হত্যা করে। এজন্যে বোন ও ভগ্নিপতিকে পানিতে মিশিয়ে কৌশলে ঘুমের ওষধ খাইয়ে ঘুমাতে পাঠায়। এর আগে সে ঘরে বোন-ভগ্নিপতির খাট বরাবর বাইরে থেকে শাবল দিয়ে সিঁধ কাটে যেন মনে হয় সিঁধ কেটে ঘাতক ঘরে ঢুকে বোনকে হত্যা করেছে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব বর্ণনা দিয়েছে ভগ্নিহন্তারক মোতাহার।

বুধবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. রফিকুল বারী তার খাসকামরায় ঘাতক মোতাহারের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

ইটনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মুর্শেদ জামান বিপিএম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইটনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আহসান হাবীব আদালতে মোতাহারের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ঘাতক মোতাহার ইটনা উপজেলার রায়টুটী ইউনিয়নের কানলা গ্রামের মৃত ইছহাক আলীর ছেলে। অন্যদিকে নিহত আকলিমা আক্তার তার আপন ছোটবোন।

মোতাহারের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে ইটনা থানার ওসি মোহাম্মদ মুর্শেদ জামান বিপিএম জানান, নিহত আকলিমা আক্তারকে একই গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে মাসুক মিয়া বিয়ে করতে চেয়েছিল। মাসুক মিয়া আকলিমা আক্তারকে বিয়ের প্রস্তাবও দেয়।

কিন্তু আকলিমার পরিবার এই বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এতে মাসুক ক্ষিপ্ত হয়ে জোরপূর্বক আকলিমাকে বিয়ের হুমকি দেয়। এ পরিস্থিতিতে উপায় না দেখে বছর খানেক আগে তাড়াইল উপজেলার বরুহা বড়হাটি গ্রামে ফুফাতো ভাই জিন্নত আলীর সঙ্গে আকলিমাকে বিয়ে দেয় তার পরিবার।

এর জের ধরে গত বৈশাখ মাসে ধান কাটা অবস্থায় মাসুক মিয়া তার লোকজন নিয়ে আকলিমার পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায় এবং আকলিমার ভগ্নিপতি বকুলকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে বাম পা ভেঙে পঙ্গু করে দেয়। হামলাকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতেও ভয় পায় আকলিমার পরিবার।

এ ঘটনার পর আকলিমার বড় ভাই মোতাহার ঢাকায় রিকশা চালানোর জন্য চলে যায়। গত কোরবানির ঈদের আগে সে মাসুক মিয়াকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করে। এজন্যে ঢাকা থেকে বাড়িতে আসার সময় সে ঘুমের ওষধ সঙ্গে নিয়ে আসে।

রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোতাহার ঘরে থাকা চাকু দিয়ে আকলিমার বুকের বাম পাশে পর পর দুটি সজোরে আঘাত করে। এ সময় আকলিমা আর্তচিৎকার দিয়ে ওঠলে চাকুটি বিছানার ওপর ফেলে দ্রুত ঘর থেকে বাইরে চলে যায় মোতাহার।

এ সময় ঘরের ভেতর থাকা সবাই ঘুম থেকে জেগে ওঠে আকলিমাকে বাঁচানোর জন্য ঘর থেকে ধরাধরি করে বারান্দায় নিয়ে আসে। এ সময় মোতাহারও ঘরের ভেতর ঢুকে বোনকে ধরাধরি করে এবং বারান্দায় আনার পর আকলিমার মাথায় পানি ঢালে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আকলিমা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এদিকে মোতাহার এ রকম নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়ে এর দায় প্রতিপক্ষ মাসুক মিয়ার ওপর চাপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশের  তদন্তে বেরিয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা। গত রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের পাঠানোর সময়েই পুলিশ নজরবন্দি করে বড় ভাই মোতাহারকে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দাফনের পর পরদিন মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে নিহত আকলিমা আক্তারের মা আরজুদা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে ইটনা থানায় মামলা দায়ের করেন।

এই মামলায় মোতাহারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। আটকের পর পুলিশের জেরার মুখে পড়ে সত্য প্রকাশ করে মোতাহার। তিনি জানান, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ছক কষেছিলেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *