নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীসহ দেশের সর্বত্রই চালের বাজারে চলছে অস্থিরতা। কারণ ছাড়ায় প্রতি সপ্তাহে দফায় দফায় বেড়ে চলেছে চালের দাম। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজি প্রতি ৬ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। এবার ধানের বাম্পার ফলনের পরও গত বছরের এই সময়ের তুলনায় চালের দাম বেড়েছে প্রায়া ১৫ শতাংশ। চাল আমদানিসহ সরকারের নানা উদ্যোগেও কোনো ফায়দা মিলেনি।

চলমান মহামারিতে বেড়েছে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা, কমে গেছে আয়। আর্থিক সংকটে সীমিত আয়ের মানুষদের নাভিশ্বাস অবস্থা। এর ওপর অন্যসব নিত্যপণ্যে মতোই বাড়তি দামে চাল কিনতে গিয়ে চিড়ে চ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ। বাম্পার ফলনের পরও বোরোর ভরা মৌসুমে দেশের মানুষকে চড়া দামে চাল কিনে খেতে হবে, এর জবাব দিতে পারছেন সংশ্লিষ্টরা। দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে চালকল মালিকদের বার বার সতর্ক করা হলেও কেউ কোনো কর্ণপাত করছেন না।

সম্প্রতি ধান-চালের অবৈধ মজুতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সারা দেশের জেলা প্রশাসকদেরকে নির্দেশও দেয়া হয়েছে। এত কিছুর পরেও কেন চালের দর ঊর্ধ্বমুখী? এমন প্রশ্ন সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাদের।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বরাবরই মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। তারা কোটি কোটি টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে গুদামে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ফলে চালের দাম তো কমছেই না, বরং আরও বাড়তির দিকে।

ঢাকার খুচরা চালের বাজারে হু হু করে বাড়ছে চালের দাম। গত সপ্তাহে মাঝারি মানের মোটা পাইজাম ও স্বর্ণা চালের দাম ছিল কেজি প্রতি ৪৮ টাকা। সেই চাল চলতি সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়। বর্তমানে খুচরা বাজারে ২৮ চাল মান ভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫৪-৬৫ টাকা পর্যন্ত, যা গত সপ্তাহে ৫০-৫২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। ভালো মানের ২৮ চাল ৫৬ টাকা কেজিতে। একইভাবে মাঝারি ধরনের নাজির শাইল ও মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৬-৬৮ টাকা কেজিতে। আর ভালো মানের সরু নাজির ও মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭২ টাকা কেজিতে।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চাল কেজিতে বেড়েছে দুই টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ এবং গত বছরের তুলনায় মোটা চালে বেড়েছে ১৪.১২ শতাংশ। এ ছাড়া মাঝারি মানের চালের দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। আর চিকন চালের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪.২৯ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কারসাজি চক্রের কারণেই চালের দাম বাড়ছে। বেশি লাভের আশায় মিলার ও মজুতদাররা ধান, চাল মজুত করে রেখেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় বাজারে ধান-চালের সরবরাহ কম। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, চালের দাম কমাতে সরকার সারা দেশে ওএমএস চালু করলেও বাজারে তা কোনো প্রভাব ফেলছে না।

বিষয়টি স্বীকার করে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ‘নব্য মজুতদারদের কারণে চালের দাম বাড়ছে। করোনার কারণে অন্য ব্যবসায় মন্দা থাকায় অনেক ব্যবসায়ী ধান, চাল কিনে মজুত করেছেন। খাদ্যমন্ত্রী ধান-চাল মজুতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন। সারা দেশের জেলাগুলোতে বাজার মনিটরিং কমিটি করার কার্যক্রম জোরদার করতে জেলা প্রশাসকদেরকেও নির্দেশ দেন তিনি। এত ব্যবস্থার পরেও ধানের অবৈধ মজুতদার সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকাম থেকেই তাদের চড়াদামে চাল কিনতে হচ্ছে। চালের মোকাম খ্যাত নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া ও জয়পুরহাটের আড়তে দাম বাড়লে তার প্রভাব সারা দেশেই পড়ে। তাদের কথা হলো, কমিশনের বিনিময়ে রাজধানীর ব্যবসায়ীরা চাল বিক্রি করেন। চালের দাম বাড়লে তাদের কোনও লাভ নেই।

আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীর ধানের দাম বৃদ্ধি ও চালের ঊর্ধ্বগতির পেছনে মোকামের চালকল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন । অসাধু চালকল মালিকরা ব্যাংক থেকে কোটি কোটি ঋণ নিয়ে ঐ টাকায় ধান কিনে মজুত গড়ে তুলেছে। বেআইনিভাবে অতিরিক্ত মজুতকৃত ধান জব্দ ও বাজারে উন্মুক্ত করা গেলে ধানের বাড়তি দাম ও চালের ঊর্ধ্বমুখী দর নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এ অভিযোগ অস্বাীকার করে চালকল মালিকদের দাবি, মৌসুমের শুরুতেই এক শ্রেণির অসাধু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ধান কিনে বড় মজুত গড়ে তুলেছে। মোকামের বড় বড় মিল মালিকদেরও এখন মজুত আছে মাত্র ১০/১৫ দিন মিল চালানোর মতো ধান। ফলে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৩০ টাকা বাড়তি দামে কিনে মিল চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদিত চালের দর বেড়ে যাচ্ছে। ধানের দাম না কমলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে না বলে জানান চালকল মালিকরা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সারাদেশে ৩ হাজার ৫০০টি অটো রাইস মিল এবং ১৮ হাজার ৫০০ রাইস মিল রয়েছে। যারা দেশে ধান-চালের বড় ক্রেতা এবং সরবরাহকারী। এদের পাশাপাশি এখন বড় বড় বেশ কয়েকটি করপোরেট কোম্পানি রয়েছে।

চালের এই মূল্য বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোসাম্মৎ নাজমানারা খানুম বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছ। টিসিবি’র মাধ্যমে ৩০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কার্যক্রমও চলছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে বেসরকারিভাবে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্কে প্রাথমিকভাবে ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অবৈধভাবে কেউ চালের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে কাজ করছে একাধিক টিম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *