ক্রীড়া ডেস্ক: 

আর্জেন্টিনা বলতে অনেকে দিয়েগো ম্যারাডোনাকে বোঝেন। আর্জেন্টিনার নাম শুনতেই অনেককে বলতে দেখা যায়, ‘ও ম্যারাডোনার দেশ?’ অনেকের কাছে ফুটবলের আরেক নামও ম্যারাডোনা। ফুটবল ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটি আজ নিভে গেছে। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বুধবার না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর।

ফুটবল জাদুকরের প্রয়াণে গোটা দুনিয়াই যেন মুষড়ে গেছে। ম্যারাডোনাভক্ত ছাপিয়ে ফুটবল ভক্তদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। বহু দূরের ম্যারাডোনার জন্য এমন অবস্থা হলে আর্জেন্টিনায় কী অবস্থা চলছে, সেটা অনুমেয়ই। শোকের দেশে পরিণত হয়েছে আর্জেন্টিনা। কিংবদন্তির প্রয়াণে তিনদিনের শোক ঘোষণা করেছে আর্জেন্টিনা সরকার।

বিশ্ব ফুটবলের এই মহানায়ক দুই সপ্তাহ আগে মস্তিষ্কে স্ট্রোকের শিকার হন। ওই সময় তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর থেকে তিনি নিজ বাসভবনেই ছিলেন ম্যারাডোনা।

আর্জেন্টিনায় বুধবার দিনের মধ্যভাগে নিজের বাসায় হৃদরোগে মৃত্যু হয় চার দশক ধরে বিশ্বে আলোচিত এই ফুটবলারের। পথ থেকে ফুটবলের প্রাসাদে যাওয়া ম্যারাডোনা ফুটবলকে যেমন করেছেন মহিমান্বিত, তেমনি তাঁর মাদকাসক্তি ছিলো বড় বেদনার জায়গা।

নিজের পায়ের জাদুতে মাতিয়েছেন বিশ্বের শত কোটি মানুষকে। কিছুদিন আগে অসুস্থ হয়ে ছিলেন হাসপাতালে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার দুই সপ্তাহের মাথায় চির নিদ্রায় গেলেন ৬০ বছরের ম্যারাডোনা।

মাঠে না থাকলেও, গত চার দশক ফুটবল ছিলো ম্যারাডোনাময়। আশির দশকে যোগ দেন আর্জেন্টিনার, জেতেন বিশ্বকাপ। সেই বিজয়ের আসরে নিজের হাতে করা একটি গোল তাকে বিতর্কে ঠেলে। ম্যারাডোনা ঈশ্বরের হাত বলে বির্তক আরো উসকে দেন। এসবকিছু ছাপিয়ে ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কিংবদন্তী ফুটবলারদের একজন।

বর্ণাঢ্য জীবনের ম্যারাডোনার শৈশব ছিলো দারিদ্র আর সংগ্রামের। শৈশবে রাস্তায় ফুটবল খেলে ফুটবলার হবার নেশায় মেতে ওঠেন। তারপর অসামান্য প্রতিভায় নিজের ফুটবল নৈপুণ্যের প্রতি নেশাগ্রস্ত করেন বিশ্ববাসীকে। ম্যারাডোনার নেশা ফুটবল মাঠের আঙিনা ছাড়িয়ে মাদকের জগতে চলে গেলে, তাঁর মাঠের খেলায় মৃত্যু ডেকে আনে।

৯০’র দশকের মাঝামাঝি মাদকের নেশায় ডুবে যান কিংবদন্তী এই ফুটবলার। ৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে মাদকাসক্তির কারণে দুই ম্যাচ পর ছিটকে পড়েন আসর থেকে। ফুটবলার হিসেবে তার বিদায় ঘন্টা বাজে। তারপর এই মাদকই তাকে আলোচনা, সমালোচনায় বারবার তুলে আনে।

তারপর তিনি মাঠে ফিরে আসেন আর্জেন্টিনার কোচ হয়ে ২০১০ সালে। কোচ হিসেবে আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপ জিতবার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ নিলেও, সেই স্বপ্ন কোয়ার্টার ফাইনালের ধাপ পেরুতে পারেনি। সেই যে মাঠ ছাড়লেন ম্যারাডোনা তারপর বিগত এক দশকে আলোচনায় থাকলেও ফুটবলের কোন বড় দায়িত্বে ছিলেন না। কিন্তু ফুটবলের অমলিন একজন মুকুট হয়ে থাকবেন চিরকাল।

খেলোয়াড় হিসেবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে জয়। ওই টুর্নামেন্টেই তিনি ‘ঈশ্বরের হাত খ্যাত’ সেই বিখ্যাত গোলটি করেন।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত গোল। ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিশ্বকাপ পর্ব শেষ হয় ইংল্যান্ডের।  ছবি: ডেইলি মেইল

ইতালিয়ান লীগে নেপোলি ক্লাবের হয়েও বিস্ময় দেখিয়েছেন। ১৯৮৭ ও ১৯৯০ সালে তার পারফরম্যান্সের সুবাদেই সিরি-এ শিরোপা জেতে ক্লাবটি। ১৯৮৭ সালের ইতালিয়ান কাপ আর ১৯৮৯ সালের উয়েফা কাপ জেতার ধারাবাহিকতাতেও ছিল তার অবদান।

ক্যারিয়ারের এই শীর্ষ সময়েই তিনি কোকেনে আসক্তিতে জরিয়ে পড়েন। ফলে ১৯৯১ সালে তাকে ক্লাবটি ছাড়তে হয়। তারপর টানা ১৫ মাস তাকে মাদক গ্রহণের দায়ে নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপেও মাদক টেস্টে পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার পর ম্যারাডোনা বাদ পড়ে যান। তারপর ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে  হৃদযন্ত্রের সমস্যায় তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন।

আজ বুধবার আর্জেন্টিনা সময় দুপুরে সর্বপ্রথম ফুটবল বরপুত্রের মৃত্যুর কথা জানায় দেশটির গণমাধ্যম- ক্লারিন। ওই সংবাদে ম্যারাডোনার মৃত্যু পুরো বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসবে বলে জানানো হয়।

এরপরই শোক সংবাদটি সম্পর্কে এক বিবৃতি দিয়ে নিশ্চিত করেন ম্যারাডোনার আইনজীবী। এঘটনা জানার পর থেকে ফুটবল জগতের সবাই তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

ইতোপূর্বে, ব্রেইন সার্জারির আটদিন পর গত ১১ নভেম্বর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান ম্যারাডোনা। অলিভোস ক্লিনিক নামে বেসরকারি হাসপাতালটি ত্যাগ করে বাড়ি ফেরার সময় হাজারো ভক্ত তাকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষা করেছিল। ভক্তদের এই ভালোবাসায় আর সাড়া দিতে পারবেন না এই কিংবদন্তি। সকলকে শোকাকুল করে তিনি মরণের অজানা জগতেই পাড়ি জমালেন।

সূত্র:- ডেইলি মেইল

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *