আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
পৃথিবীর বৃহত্তম সামাজিক গণমাধ্যম ফেসবুক। ভার্চুয়াল জগতে বিনোদন, পণ্য বা সংবাদের প্রচার-প্রচারণা সবকিছুই ব্যবহারকারীর হাতের নাগালে নিয়ে এসেছে এই সাইটটি।

কিন্তু, বিগত কয়েক বছর ধরেই মিথ্যে বা ঘৃণামূলক প্রচারণা এবং হিংসা ছড়াতে এর ব্যাপক ব্যবহার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফেসবুকের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিশ্ব গণমাধ্যমে।

তবে ভুল সংশোধন করার জোর সম্ভবত ফেসবুকের নীতি-নির্ধারকদের অভ্যাস নয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণা অন্তত সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়।

মহামারির মাঝে জনগণকে কোভিড-১৯ রোগ সম্পর্কে মিথ্যে তথ্য দেওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত- নানা ধরনের স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এমন অসংখ্য ওয়েবসাইট রয়েছে, যেখান থেকে সহজেই মহামারি সৃষ্টিকারী ভাইরাস সার্স কোভ-২ এবং কোভিড-১৯ রোগ সম্পর্কে প্রতারিত হতে পারেন সাধারণ মানুষ। শুধু গত এপ্রিলেই ৫০ কোটির বেশি বার এসব ওয়েবসাইটে গেছেন নেটিজেনরা। মহামারির প্রকোপ যখন বাড়ছে, ঠিক সেই সময়ে এখবর নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।

মহামারির শুরুর দিকেই জনস্বাস্থ্য নিয়ে অপপ্রচারকারী গোষ্ঠী বা ওয়েবসাইটগুলোর প্রচারণা বন্ধের অঙ্গিকার করেছিল ফেসবুক। প্রতিশ্রুতি দেয় নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং অসঙ্গতিপূর্ণ সংবাদ উৎসকে ‘নিউজফিডে’ স্থান না দেওয়ার। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীরা বলেছিলেন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন তারা। তবু সাম্প্রতিক সময়ে সেই মিথ্যে প্রচারণামূলক সাইটগুলোর সংবাদের দিকেই সাধারণ জনতাকে ঠেলে দিয়েছে ফেসবুক- এমন তথ্য দিয়েছে অধিকার গোষ্ঠী আভাজ-এর গবেষণালদ্ধ ফলাফল।

ইতোপূর্বে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় নেতৃত্ব দেয়। গবেষণা নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়- ‘আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন’ শীর্ষক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সম্মানজনক এক সাময়িকীতে।

”চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত মিথ্যে তথ্য অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে”- নিবন্ধে এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। গবেষকরা সেখানে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত এমন একটি মিথ্যে তথ্যের কারণে- ৮ শতাধিক মানুষের মৃত্যুর সংযোগও তুলে ধরেন প্রমাণ হিসেবে।

আভাজ প্রতিবেদন এসব তথ্যকে সমর্থন করছে। তাদের প্রতিবেদনটির কেন্দ্রেই ছিল ফেসবুকে চালানো প্রচার-প্রচারণা। ফেসবুকে বিদ্যমান নানা বিভ্রান্তিকর পেজ এবং ওয়েবসাইটের প্রচারনা তুলে ধরে জানানো হয়, এদের অধিকাংশই করোনাভাইরাস সম্পর্কে মানুষকে ভুল তথ্য দিচ্ছে।

বিকল্প ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রাকৃতিক কৃষি, উগ্রপন্থী রাজনৈতিক দল বা গড়পরতা ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকের দল- সকল ধরনের গোষ্ঠীর পেজ থেকেই চালানো হয় অপপ্রচার।

গবেষণা প্রতিবেদনটি আরও জানাচ্ছে, বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়াতে বর্তমানে সক্রিয় আছে ৮২টি সাইটের এক নেটওয়ার্ক। আর গতবছর বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশে ফেসবুকে এসব সাইট প্রদর্শনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৮০ কোটি। চলতি বছরের এপ্রিল নাগাদ এই সংখ্যা প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক আকারে রূপ নেয়। ওই এক মাসে সাইটগুলো ৪৬ কোটি ভিউ অর্জন করে ফেসবুকে।

”এ প্রবণতা নির্দেশ করে যে, সাধারণ নাগরিকেরা যখন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য খুঁজেছেন- এবং যখন ফেসবুকও নানা দেশের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পেজের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে, ঠিক তখনই ভার্চুয়াল মাধ্যমটির অ্যালগরিদম এসব চেষ্টাকে নস্যাৎ করেছে” প্রতিবেদনে বলা হয়।

আভাজ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি অলাভজনক সংস্থা; যারা জলবায়ু পরিবর্তনের সচেতনতা সৃষ্টি, মানবাধিকার, প্রাণি অধিকার, দূর্নীতি দমন, দারিদ্র্য এবং সংঘাত নিরসনের মতো বহুবিধ ইস্যুতে কাজ করে।

অধিকার গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, একটি ছোট কিন্তু বেশ প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য নিয়ে মিথ্যে তথ্যের সাইটগুলোতে সাধারণ নাগরিকদের আকৃষ্ট করার কাজ চালিয়ে যায়। এ ধরনের ৪২টি ”সুপার স্প্রেডার” সাইট শনাক্ত করতে সমর্থ হয় আভাজ। এসব সাইটে নুন্যতম ২কোটি ৮০ লাখ থেকে সর্বাধিক ৮০ কোটির বেশি অনুসরণকারী রয়েছে।

মিথ্যে প্রচারের সময়ে সত্যিকার গ্রহণযোগ্য স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষগুলোর নাম ব্যবহার করা হয়। এমনই এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, কোভিড-১৯ এ মৃত রোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাতে নাকি চিকিৎসক এবং হাসপাতালগুলোকে উৎসাহ যোগাচ্ছে- আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন। মারাত্মক অসত্য এ তথ্যটি মানুষ পড়েছে ১৬ কোটি বার।

ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেকে সুরক্ষিত রাখতে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাগুলোকে ঢেলে সাজাতে ব্যর্থ হয়েছে, ভণ্ড সাইটগুলোর বাড়-বাড়ন্ত সেদিকেই আলোকপাত করে। মহামারির এ প্রাণান্তকর সময়েও কোম্পানিটি প্রতিশ্রুতি দিয়েও ভোক্তাদের ”নিরাপদ এবং সঠিক তথ্যসমৃদ্ধ” করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এব্যাপারে সামাজিক গণমাধ্যমে অপপ্রচার নিয়ে একটি সংসদীয় তদন্তে নেতৃত্বদানকারী ব্রিটিশ এমপি ডেমিয়ান কলিন্স বলেন, ”আভাজের সহায়তায় করা সাম্প্রতিক গবেষণা মহামারির মধ্যেও জনস্বাস্থ্য নিয়ে মিথ্যে প্রচারণা বন্ধে ফেসবুকের সম্পূর্ণ ব্যর্থতার চিত্রকে আবারো জনসম্মুখে এনেছে। মিথ্যেকে বহুগুণে প্রসার করার ফেসবুকের সহজাত গুণটিও তুলে ধরে এটি।”

তিনি আরও বলেন, ফেসবুকে এখনও বিপদজনক এসব কন্টেন্ট কোনো প্রকার সতর্কবার্তা ছাড়াই দেদারছে ছড়াচ্ছে। সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ফেসবুক নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের জন্য এটাই উপযুক্ত সময়। নিজ প্লাটফর্মকে শুদ্ধ করে; মিথ্যের এই মহামারি থেকে বিশ্বকে মুক্ত করতে তিনি সাহায্য করবেন, এটাই সকলের প্রত্যাশা।”

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *