নিজস্ব প্রতিবেদক:

এশার ফরজ নামাজ শেষ। মুসল্লিদের অনেকে সুন্নত নামাজ পড়ছেন। হঠাৎ একযোগে বিস্ফোরণ ঘটে মসজিদের ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র-এসিতে। মুসল্লিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হুড়াহুড়ি করে অনেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে যায়। ততক্ষণে বেশির ভাগ মুসল্লি দগ্ধ হন। এঁদের মধ্যে সাত  বছরের এক শিশু মারা গেছে। তার নাম জুয়েল।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বাইতুস সালাম জামে মসজিদে গতকাল শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। দগ্ধ মুসল্লিদের বেশির ভাগেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ৩৮ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।

তিনি বলেন, বার্ন ইউনিটে ভর্তি মুসল্লিদের মধ্যে বেশির ভাগেরই ‘মেজর’ বার্ন। তাঁদের সবারই শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দগ্ধদের অনেককে আইসিইউতে পাঠানো হয়েছে। সব কিছু শেষ না হওয়া পর্যন্ত সঠিকভাবে কতজনকে কোথায় নেওয়া হলো তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এক কথায় বলতে  গেলে, কারো অবস্থাই ভালো নয়।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি মুসল্লিদের মধ্যে রয়েছেন মো. ফরিদ (৫৫), শেখ ফরিদ (২১), মনির (৩০), মোস্তফা কামাল (৩৫), রিফাত (১৮), মাইনুউদ্দিন (১২), মো. রাসেল রাশেদ, নয়ন, বাসার মোল্লা, বাহাউদ্দিন, শামীম হাসান, জোবায়ের, জয়নাল, মোহাম্মদ আলী সাব্বির, মোহাম্মদ আলী, মামুন, কুদ্দুস বেপারী, মোহাম্মদ নজরুল, সিফাত, আব্দুল আজিজ, নিজাম, মো. পেনান, নাদিম হুমায়ুন, ফাহিম, জুলহাস, ইমরান হোসেন, আব্দুস সাত্তার, আমজাদ, মসজিদের ইমাম আবদুল মালেক, মুয়াজ্জিন দেলোয়ার  হোসেনসহ আরো দুজন।

জানা গেছে, মসজিদে ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো মুসল্লি ছিলেন। ওই সময় মসজিদে বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ আসার পরপরই এসিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপরই মসজিদে বিদ্যুৎ চলে যায়।

স্থানীয় লোকজন জানায়, মুসল্লিরা আর্তচিৎকার করতে করতে মসজিদের বাইরে বের হন। মসজিদের আশপাশে সড়কে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে তাঁরা গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আরেফিন জানান, ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে ৯ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এর আগে স্থানীয় লোকজন বেশির ভাগ দগ্ধ ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। দগ্ধদের অবস্থা এত খারাপ ছিল যে তাঁদের শরীরে হাত দেওয়া যাচ্ছিল না।

নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুল হোসেন জানান, রাত ৯টা থেকে একের পর এক দগ্ধ মুসল্লি আসছিলেন। তাঁদের সবার নাম লিপিবদ্ধ করা হয়নি। যাঁরা এসেছেন তাঁদের শরীরের ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। তাঁদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তিনি আরো জানান, যে ২০ থেকে ২৫ জন এসেছিলেন, তাঁদের কয়েকজনের শরীরে ৯৯ ভাগ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে।

মসজিদটি চারতলা। তিনতলা পর্যন্ত জামাত হয়। চারতলার কিছু অংশ মেস। ঘটনার পর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিস্ফোরণে সিলিং ফ্যানগুলো বেঁকে গেছে। জানালার কাচ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়েছে। মসজিদের মেসের ভাড়াটিয়া শাওন জানান, প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে আগুন ও কালো ধোঁয়া চারতলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

মসজিদের মেঝের নিচ দিয়ে গ্যাসের লাইন গেছে। ফায়ার সার্ভিসের  সদস্যরা পানি ছিটানোর কারণে গ্যাসের বুদ্বুদ্ বের হচ্ছিল। ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আসলাম হোসেন বলেন, গ্যাসের লিকেজের কারণে সম্ভবত এই বিস্ফোরণ। মসজিদটির নিচ দিয়ে তিতাস গ্যাসের লাইন আছে। আর পুরো মসজিদটি থাই গ্লাসে বদ্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

পরে ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশর অ্যান্ড মেইনট্যানেন্স) লে. ক. জিল্লুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মসজিদটি থাই গ্লাসে আবদ্ধ ছিল। নিচ দিয়ে যাওয়া গ্যাসের পাইপের লিকেজ থেকে গ্যাস জমছিল। এই কারণে সম্ভবত বিস্ফোরণ ঘটেছে। সম্ভাব্য অন্যান্য কারণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর জমশের আলী ঝন্টু বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পরই আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, ভেতরে একের পর এক লোকজন পড়ে আছে। ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা গরম তেল লোকজনের ওপরে পড়ে। তাঁদের সবাই দগ্ধ হন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *