অনলাইন ডেস্ক:


বুধবার থেকে দেশে লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস, গণপরিবহন, দোকানপাট সবই চালু হয়েছে। তবে লকডাউন শিথিল হলেও দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। টানা ১৮ দিন ধরে দিনে দুইশোর বেশি মৃত্যু রেকর্ড হচ্ছে। এখনও দেশের ৬০টি জেলা করোনাভাইরাস সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বুধবার সবচেয়ে বেশি শনাক্তের হার ছিল মুন্সিগঞ্জে ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম ৫ দশমিক ১ শতাংশ শনাক্তের হার ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।

তৃতীয় ওয়েভের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে শনাক্তের হার ছিল ৭০ শতাংশ । কঠোর লকডাউন ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সংক্রমণ রোধের `চাঁপাই মডেলের’ মাধ্যমে জেলায় কোভিড পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

বিভাগগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে করোনাভাইরাসের শনাক্তের হার ছিল সবচেয়ে বেশি ২৯ দশমিক ১২ শতাংশ ও ২৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। সবচেয়ে কম ১৩ দশমিক ০৭ শতাংশ শনাক্তের হার ছিল রাজশাহী বিভাগে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) মতে, যেসব জেলায় শনাক্তের হার ১০ শতাংশের ওপরে, তাদের ‘উচ্চ ঝুঁকি’র অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৫ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত শনাক্তের হারযুক্ত অঞ্চল ‘মধ্যম ঝুঁকি” এবং ৫ শতাংশের কম শনাক্ত হারসম্পন্ন অঞ্চল ‘নিম্ন ঝুঁকি’র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দেশের ৬০টি জেলায় বর্তমানে করোনাভাইরাসের শনাক্তের হার ১০ শতাংশের বেশি। বুধবার ৪০ শতাংশের বেশি শনাক্তের হার ছিল দুটি জেলায়, ১৩টি জেলায় ৩০ শতাংশের বেশি, ২৭ জেলায় ২০ শতাংশের বেশি ও ১৭টি জেলায় পজিটিভিটি রেট ছিলো ১০ শতাংশের বেশি। তবে নাটোর, পাবনা, জয়পুরহাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এই চার জেলায় শনাক্তের হার ১০ শতাংশের নিচে ছিল।

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৪ ঘণ্টায় ২৩৭ জনের মৃত্যু এবং ১০ হাজার ৪২০ জনের দেহে নতুন করে ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার কথা জানায়। দৈনিক শনাক্তের হার ছিল ২৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক নজরুল ইসলাম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “শনাক্তের হার পর পর দুই সপ্তাহ ৫ শতাংশের নিচে হলে তখন সংক্রমণ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলা যাবে। সারাদেশের দৈনিক শনাক্তের হার ২৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ হওয়ার মানে সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। এরইমধ্যে, অর্থনীতি বাঁচাতে লকডাউন শিথিল করে সবকিছু খুলে দেওয়া হলো। জীবন বাঁচাতে এখন প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করে শতভাগ মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। আর দ্রুত অনেক মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে।”

আইইডিসিআরের পরামর্শক ড. এম মুশতাক হুসাইন টিবিএসকে বলেন, “জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে সবকিছু খুলে দেওয়া হলেও সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি বিপদসীমার নিচে না নামা পর্যন্ত সতর্কতার ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”

তিনি আরও বলেন, সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে হলে মৃদু লক্ষণযুক্ত রোগীদের টেলিমেডিসিনের মাধ্যমেও হলেও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। এখন বড় বড় হাসপাতাল না বাড়িয়ে আইসোলেশন সেন্টার বানাতে হবে। যেখানে মৃদু লক্ষণযুক্ত রোগীরা থেকে সেবা নিবেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি ও ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে।

এখনো রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। ঢাকার কোভিড ডেডিকেটেড সরকারি ১৭টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে কুর্মিটোলা, মুগদা, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ ১০টি হাসপাতালে বুধবার কোন আইসিইউ শয্যা খালি ছিল না। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নির্ধারিত জেনারেল বেডের তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গত সপ্তাহে বরিশাল বিভাগে সাধারণ শয্যা সবথেকে বেশি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পূর্ণ ছিল। অন্যদিকে, চট্টফ্রাম বিভাগে সবথেকে বেশি ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত আইসিইউ শয্যায় রোগীরা ভর্তি ছিলেন। সিলেটে এই হার ৯৫ শতাংশ এবং খুলনা ও ঢাকায় এই হার ৯০ শতাংশ।

গত ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা শনাক্তের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে আইডিসিআর এপ্রিল মাসে জানিয়েছিলে, রাজধানীর ১৯টি থানা এলাকা করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব থানায় টেস্টের বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৩১ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তখন রূপনগর ও আদাবর এলাকা চিহ্নিত করা হয়। সেখানে শনাক্তের হার ছিল যথাক্রমে ৪৬ শতাংশ ও ৪৪ শতাংশ।

ঢাকার কোন এলাকায় এখন সংক্রমণ বেশি তা নিয়ে কোনও তথ্য দেয়নি আইডিসিআর। তবে ঢাকা শহর ও ঢাকা বিভাগে শনাক্তের হার এখন ২০ শতাংশের বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম বলেন, “গত তিন ধরে সংক্রমণের হার সামান্য কিছুটা কমেছে। জেলাগুলোর মধ্যে ঢাকা জেলায় রোগী সবচেয়ে বেশি। মহামারি মোকাবেলায় টিকা গ্রহণ জরুরি। যারা ভ্যাকসিন নিতে রেজিস্ট্রেশন করেছেন তারা যেনো ভ্যাকসিন নেন, আর ব্যক্তিগত সুরক্ষা কখনো অবহেলা করা যাবে না। নিজে সুরক্ষিত থাকলে পরিবার ও দেশ সুরক্ষিত থাকবে।”

অবলম্বনে-টিবিএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *