রাজবাড়ী প্রতিনিধি:
চাকরি দেওয়ার নাম করে অনেক মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার গোলাম মাহবুবের বিরুদ্ধে। এছাড়াও সপ্তাহখানেক আগে তার ইয়াবা সেবনের একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে।

বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।

স্থানীয়রা জানায়, জেলা রেজিস্ট্রার গোলাম মাহবুব চাকরি দেওয়ার নাম করে রাজবাড়ী সদর, পাংশা ও বালিয়াকান্দি উপজেলা এলাকার বহু মানুষের কাছ থেকে অন্তত অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

জেলার সদর উপজেলার শহীদ ওহাবপুর ইউনিয়নের আহ্লাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা রিনা আক্তার এমএ পাশ একজন গৃহিনী। সংসারে একটু স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য চাকরি করতে চেয়েছিলেন। চাকরির আশায় ধার দেনা করে তিন বছর আগে রাজবাড়ী জেলা রেজিস্ট্রার গোলাম মাহবুবকে তিন দফায় দিয়েছেন দেড় লাখ টাকা। তার চাকরি হয়নি, টাকাও ফেরত দেননি গোলাম মাহবুব।

রিনা আক্তার বলেন, আমার স্বামীর ছোট্ট একটি ওষুধের দোকান আছে। সংসার ভালোভাবে চলে না। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে রেজিস্ট্রি অফিসে নকলনবীশ পদে চাকরির জন্য তিন দফায় গোলাম মাহবুবকে দেড় লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু চাকরি হয়নি। আজকাল বলে ঘোরাতে থাকেন। এক সপ্তাহ এক সপ্তাহ করে সময় নেন। এই চাকরির আশায় অন্য কোনো জায়গায় আবেদনও করিনি। চলতি বছর জানুয়ারি মাসে তার চাকরির বয়সও শেষ হয়ে গেছে।

একদিন তার অফিসে গেলে গোলাম মাহবুব বলেন, কাজ হয়ে গেছে। আর এক সপ্তাহ লাগবে। একদিন তাকেবলা হয় চাকরি ফাইনাল। তবে আজই এক লাখ টাকা লাগবে। আমরা টাকা দিতে অস্বীকার করায় ব্লাঙ্ক চেক দিতে বলেন। আমরা তাই দিয়েছি। কিন্তু চাকরি আর হয়নি। যখন বুঝতে পারলাম আমার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে তখন টাকা ফেরত চাই। কিন্তু টাকা আর ফেরত দেননি।

তিনি ক্ষোভের সঙ্গে আরও বলেন, আমার জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন গোলাম মাহবুব। এই ক্ষতি পূরণ করবে কে?

রিনা আক্তারের মত এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকেই। তেমনই একজন আহ্লাদিপুর গ্রামের মৃত শেহের আলী শেখের স্ত্রী জাহানারা বেগম। গত ১৬ জুলাই রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের কাছে মাহবুবের প্রতারণার প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসন কোনো পদক্ষেপই নেয়নি বলে অভিযোগ জাহানারার।

জাহানারা বেগম জানান, তার ছেলে ইকলাস শেখ এমএ পাশ করে বেকার বসে আছেন। তার জামাতা সুজন শেখ সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক। সুজনের মাধ্যমেই জেলা রেজিস্ট্রার গোলাম মাহবুবের সঙ্গে পরিচয়। তার ছেলের চাকরির জন্য কয়েক দফায় গোলাম মাহবুবকে সাড়ে চার লাখ টাকা দেন। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও চাকরি হয়নি ছেলের। একবার একটি নিয়োগপত্র দেন মাহবুব, কিন্তু সেটিও ছিল ভুয়া।

তিনি বলেন, পরে মাহবুবের কাছে টাকা ফেরত চাইতে গেলে নানান টালবাহানা করতে থাকেন। একবার দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেন। গোলাম মাহবুব আস্ফালন করে বলেন, ‘কত চাকরি প্রার্থীর টাকা নিছি। কেউ কিছু করতে পারে নাই। সাংবাদিকরাও আমার কিছু করতে পারবে না। তুইও আমার কিছু করতে পারবি না।’ আবার টাকা চাইতে গেলে ছেলে ইকলাস ও জামাতা সুজনকে হত্যা করবে বলেও হুমকি দিয়েছেন গোলাম মাহবুব।

জাহানারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা হতদরিদ্র মানুষ। সমিতি থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ছেলের চাকরির জন্য টাকা দিয়েছি। আমারতো আর কেউ নাই। ছেলেটা একেবারে ‘পঙ্গু’ হয়ে গেছে। এসব বিষয়ে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার পাইনি।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড় এলাকার হার্ডওয়ার ব্যবসায়ী মো. শহীদও হয়েছেন গোলাম মাহবুবের প্রতারণার শিকার। তিনি জানান, তার স্ত্রীর চাকরির জন্য দুই বছর আগে তিন দফায় দুই লাখ টাকা দিয়েছেন গোলাম মাহবুবকে। কিন্তু চাকরি হয়নি।

মো. শহীদ বলেন, প্রথমে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে টাকার অঙ্ক বাড়াতে থাকে। শেষ পর্যন্ত চার লাখ টাকা চেয়েছিল। আমরা আর দেইনি। চাকরি না হওয়ায় টাকা চাইতে গেলে গোলাম মাহবুব নানান হুমকি ধমকি দেন। বলেন, ‘যেভাবে পারো টাকা তুলে নিও।’

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গোলাম মাহবুবের মোবাইলে বার বার ফোন দিলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। পরে কথা বলার জন্য গত ২০ আগস্ট তার অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। এরপর ২৩ আগস্ট অফিস গিয়েও দেখা যায় তিনি নেই। এদিন অফিসের একজন কর্মচারি জানান, গোলাম মাহবুব অসুস্থতাজনিত ছুটিতে রয়েছেন। এক সপ্তাহ ধরে আসছেন না।

এ বিষয়ে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম বলেন, জাহানারা বেগমের অভিযোগের বিষয়টি মনে নেই। তবে গোলাম মাহবুবের বিরুদ্ধে অফিসে ঠিকমতো কাজ না করার বেশ কয়েকটি মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের কোনো কিছু আমার আওতায় পড়ে না। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতে হলে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছুটি নেওয়ার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *