জেলা প্রতিনিধি,দিনাজপুর:
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলায় গ্রেপ্তার আসাদুল ইসলামকে প্রধান অভিযুক্ত বলা হচ্ছে। তবে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, এ হামলায় সে ছাড়াও ‘প্রধান’ কেউ আছে। আসাদুলের পেছনে থাকা সেই আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টাও চলছে।

সেটা সম্ভব হলেই ইউএনওর ওপর হামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন হতে পারে বলে মনে করছে তদন্ত সংস্থা ডিবি।

আসাদুলকে গতকাল রোববার আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা ডিবির তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, আসাদুল ‘চুরি করতে গিয়ে’ হামলার কথা বললেও তা এখনই তারা মানতে চান না। ইউএনও ওয়াহিদা খানমের সরকারি কার্যক্রমে কেউ নাখোশ ছিল কিনা এবং ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল কিনা- সে প্রশ্নের উত্তরও খোঁজা হচ্ছে।

এদিকে, ঢাকার আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শাহজাহান শেখ ও সোহেল রানা নামে আরও দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ।
গতকাল ভোরে তাদের আটক করা হয়। শাহজাহানের বাড়ি ঘোড়াঘাট উপজেলার বানিয়াল পালশা গ্রামে এবং সোহেলের বাড়ি চক বাসুনিয়া বিশ্বনাথপুরে।

গত বুধবার রাতে ইউএনওর সরকারি বাসভবনের ভেন্টিলেটর ভেঙে বাসায় ঢোকে দুর্বৃত্তরা। এর পর ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের ওপর নৃশংস হামলা চালানো হয়। ওই হামলার ঘটনায় ইউএনওর ভাই শেখ ফরিদ বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘোড়াঘাট থানায় মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে দিনাজপুর জেলা ডিবি তদন্ত করছে।

ওই হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাব শুরুতেই আসাদুল ইসলাম, রংমিস্ত্রি নবিরুল ইসলাম ও সান্টু রায়কে গ্রেপ্তার করে। পরে সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই তিনজন ইউএনওর ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে।

আসাদুলকে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে র‌্যাব জানায়, ‘চুরি করতে গিয়ে’ দেখে ফেলায় তারা হামলা চালিয়েছে। যদিও র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেছিলেন, আসামি এমন তথ্য দিলেও অধিকতর তদন্তের আগে হামলার মোটিভ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না। পরে ওই ঘটনায় দায়ের মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব জেলা ডিবির কাছে ন্যস্ত হলে র‌্যাব তিন আসামিকেই তাদের কাছে হস্তান্তর করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দিনাজপুর জেলা ডিবির পরিদর্শক ইমাম জাফর বলেন, তিন আসামির মধ্যে গত শনিবার নবিরুল ইসলাম ও সান্টু রায়কে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল আসাদুল ইসলামকেও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে কিছু তথ্য দিয়েছে। তা যাচাই করে অভিযান চলছে।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আসাদুলসহ অন্য আসামিরা চুরি করতে গিয়ে হামলার দাবি করলেও এখনই তা আমলে নেওয়া হচ্ছে না। ওই বিষয়টি তদন্তের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ইউএনও সরকারি কাজ করতে গিয়ে কারও শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন কিনা এবং ওই হামলার পেছনে তার ব্যক্তিগত শত্রুতা রয়েছে কিনা, তাও তদন্ত করা হচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট দিনাজপুর জেলা পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত তাদের তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে মনে হচ্ছে, যে কারণেই ঘটনা ঘটুক, তাতে আসাদুল প্রধান অভিযুক্ত বা প্রধান আসামি নয়। তার পেছনেও কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে। সেই ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। রিমান্ডে থাকা তিন আসামি বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। তারা এখন পর্যন্ত যেসব সহযোগীর নাম বলেছে; প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা গেছে তাদের অনেকের অবস্থান ঘটনার আগে-পরে দিনাজপুরেই ছিল না।

ইউএনওর চিকিৎসা দেশেই :এদিকে, গতকাল সকালে ওয়াহিদা খানমকে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের আইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। গতকাল তাকে সেখানে দেখতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়ে মন্ত্রী জানান, ইউএনওকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, হামলার শিকার ওয়াহিদা খানমের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। মনে হয়েছে, তিনি সুস্থ আছেন। চিকিৎসকরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীও ইউএনওর খোঁজ নিচ্ছেন।

ওয়াহিদা খানমের চিকিৎসার তত্ত্বাবধানকারী চিকিৎসক অধ্যাপক জাহেদ হোসেন জানান, তিনি হামলার পর জ্ঞান হারানোর আগের ঘটনা মনে করতে পারছেন। এটা ভালো লক্ষণ। তার জ্ঞানের মাত্রা শতভাগ ঠিক আছে। এই চিকিৎসক সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওয়াহিদার হার্ট, রক্তচাপ, স্নায়ুতন্ত্র ঠিকমতো কাজ করছে। অক্সিজেন সেচুরেশন স্বাভাবিক আছে। তবে তার শরীরের ডান পাশ এখনও অবশ। এ জন্য তাকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। মাথায় এখনও ব্যথা আছে। মাথার ব্যথাটা কিছুদিন থাকবে; পরে ধীরে ধীরে কমে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *